সমাজ
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
স্লোগান গণমানুষের বুকের মাঝে জমে থাকার ক্ষোভের বিস্ফোরণের পাশাপাশি মনের চাওয়া পাওয়ার জাগতিক দলিল। তবে স্লোগান মানুষের বুদ্ধি নাকি আবেগ থেকে সৃষ্টি হয়, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। সার্থক কবিতার মতো স্লোগানেরও রয়েছে অনুভূতির সংক্রমণশীলতা। তাই স্লোগান মাঝে মাঝে আমজনতাকে আবেগে ভিজিয়ে দেয় নতুন ভোরের প্রয়োজনে।
রাজনীতি বা স্বৈরাচারবিরোধী জনচেতনায় কড়া নাড়ার বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে। বক্তৃতা, দেওয়ালচিত্র, গণসঙ্গীতের মতো স্লোগানও একটি শক্তিশালী পন্থা। স্লোগান মূলত কতকগুলো আকর্ষণীয় শব্দগুচ্ছ, পুনরাবৃত্তিমূলক অভিব্যক্তি, যা নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহƒত হয়। একইভাবে জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা অপশাসনের বিরুদ্ধে মুখর হতে নির্যাতিতরা স্লোগানের আশ্রয় নেয়।
ভারতের একটি সার্থক ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান হলো ‘বন্দে মাতরম’। আজও একে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে। আর একটি জনপ্রিয় স্লোগান হলো ‘জয় হিন্দ’। আজাদ হিন্দ বাহিনীর মেজর আবিদ হাসান সাফরানি ‘জয় হিন্দুস্থান কি’ স্লোগানটি ছোট করে ‘জয় হিন্দ’ চালু করেন। উর্দু কবি হাসরত মোহানি ১৯২১ সালে একটি সাড়া জাগানো স্লোগান লিখেছিলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
চব্বিশের দুনিয়াকাঁপানো গণবিপ্লবে জেন-জিদের অবিস্মরণীয় স্লোগানের ছন্দ ও সুরের অদম্য শক্তি খুব সহজেই বাংলাদেশের মানুষের হƒদয়ে কড়া নাড়ে। বিশেষত আগস্টের ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আন্দোলন গতিময় করেছে বেশকিছু কবিতা, গান, পোস্টার, কার্টুন আর অসামান্য দেয়াললিখন। কিছু কিছু স্লোগান বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল দিকে দিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইলেকট্রনে ভেসে তা মুহূর্তে পুরো দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এই গণআন্দোলনে এত বিচিত্র ধরনের গান, স্লোগান, কার্টুন, দেয়াললিখন ও মিম তৈরি করেছে, ইতিহাসে যার নজির খুঁজে পাওয়া ভার।
জুলাই ২৪ অভ্যুত্থানের স্লোগানগুলো আলাদাভাবে দাগ কেটেছে মানুষের মনে। গণবিদ্রোহের ইতিহাসে অনন্য এই জেনজি অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক স্লোগানগুলোও। দেখা গেছে, কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিতে নিতে বদলে গেছে আন্দোলনের দাবি, মিছিলের স্লোগান ও অভ্যুত্থানের ভাষা। আন্দোলনের শুরুতে স্লোগান ছিল, ‘কোটা না মেধা? মেধা, মেধা’ কিংবা ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’-এর মতো স্লোগান। ১৫ জুলাই রাতে শেখ হাসিনা যখন আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করলেন, দেশের জেন-জিরা আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বদলে যায় তাদের স্লোগানের ভাষা। তারা স্লোগান দিতে থাকে, ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’; ‘চাইলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’; ‘লাখো শহীদের দামে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’।
এই পর্যায়ে এসে একটি আওয়ামী সোগান ছিল ‘আছিস যত রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’-এর পাল্টা সোগান শোনা যায় ‘স্বৈরাচার, স্বৈরাচার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। কিংবা ‘জনে জনে খবর দে, ছাত্রলীগের কবর দে’।
১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হলে তার ছবি আন্দোলনকারীদের অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়। দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদের ছবি হয়ে ওঠে প্রতিরোধ আর বিপ্লবের ঝলমলে আইকন। এদিন থেকে স্লোগানের মেজাজও বদলাতে থাকে। পুলিশি সহিংসতা আর নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপরে গুলি চালানোর ফলে স্লোগানেও তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। আন্দোলনকারীরা স্লোগান দেন, ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে’। কিংবা সরাসরি সাঈদের ছবি ব্যবহার করে অনলাইনে বা অফলাইনে দেখা যায়, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’-এর মতো স্লোগান। এই সময় থেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচারেরও দাবি ওঠে। স্লোগানে তার ভাষা হয়ে ওঠে, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে’ কিংবা ‘লাশের ভিতর জীবন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’।
ধীরে ধীরে মৃত্যুর মিছিল বাড়ে। আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার ক্ষোভও বাড়ে। গুলিতে শত শত জেন-জি রাজপথে লুটিয়ে পড়ে। সরকারের পতন ঘটানোই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে যায় আন্দোলনকারীদের। স্লোগান ওঠে, ‘এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা, গদি ছাড়’, ‘দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ কিংবা ‘এক দফা, এক দাবি স্বৈরাচার তুই কবে যাবি’। ৪ আগস্ট শহীদ মিনার থেকে আন্দোলনকারীরা গণভবন ঘেরাওয়ের উদ্দেশে দেন লংমার্চের ডাক। জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানিয়ে স্লোগান ওঠে, ‘ঢাকায় আসো জনতা, ছাড়তে হবে ক্ষমতা’। ৫ আগস্ট সকাল থেকে শোনা যায় হাসিনা পালিয়ে গেছেন দেশ ছেড়ে। তখন স্লোগান ওঠে, ‘পালাইছে রে পালাইছে, হাসিনা পালাইছে’।
জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে বা সুসংগঠিত দলের নেতৃত্বে হয়নি। জেন-জির হাত দিয়ে সংঘটিত হওয়া একুশ শতকের সবচেয়ে যুগান্তকারী অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।