যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মোরেলগঞ্জের ঐতিহাসিক নীলকুঠি

সাইফুল ইসলাম কবির

, বাগেরহাট

প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুলাই,২০২৬, ১২:০০ পিএম
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মোরেলগঞ্জের ঐতিহাসিক নীলকুঠি

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ব্রিটিশ শাসনামলের ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘মোরেলদের নীলকুঠি’ বা কুঠিবাড়ি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরনো এই স্থাপনাটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৪৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি মিসেস মোরেল তার দুই ছেলে রবার্ট মোরেল ও হেনরি মোরেলের নামে এ অঞ্চলের পত্তনি গ্রহণ করেন। পানগুছি ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা আবাদ করে বসতি স্থাপন এবং নীলচাষ শুরু করেন। বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক এনে গড়ে তোলা হয় বিশাল আবাসস্থল কুঠিবাড়ি।

এখানে ছিল আস্তাবল, পিলখানা, নাচঘর, গুদামঘর, কাছারিবাড়ি, লাঠিয়ালদের জন্য পৃথক আবাসন এবং নির্যাতন কক্ষ। সুন্দরবনের বাঘসহ হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে চারপাশে নির্মাণ করা হয় সুউচ্চ প্রাচীর।

দীর্ঘদিন এই ভবনে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। পরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

ভবনের দরজা, জানালা, গ্রিল, সিন্দুক, সিঁড়িসহ বহু মূল্যবান স্থাপত্য উপাদান চুরি বা বেহাত হয়ে গেছে। একই অবস্থা স্মৃতিস্তম্ভেরও। ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন।

মোরেলগঞ্জের ইতিহাসে কুঠিবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক নেতা রহিমুল্লাহর বীরত্বগাথা। নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি অন্যতম প্রতিরোধযোদ্ধা।

জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, কলকাতায় লেখাপড়া ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসে রহিমুল্লাহ তার ভাইদের নিয়ে প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমি আবাদ করেন। রবার্ট মোরেল তার কাছে খাজনা দাবি করলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে পেয়াদা পাঠানো হলে রহিমুল্লাহ প্রতিবাদ হিসেবে একটি কাঠের বাক্সে ছেঁড়া জুতা পাঠিয়ে দেন।

এরপর মোরেলপক্ষ স্থানীয় এক সহযোগীকে পত্তনি প্রদান এবং ১৮৬১ সালের ২১ নভেম্বর শতাধিক লাঠিয়াল নিয়ে রহিমুল্লাহর বাড়িতে হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিরোধে মোরেল বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নিহত হন। হেনরি মোরেল ও তাদের ম্যানেজার হেইলি রহিমুল্লাহর হাতে আটক হলেও অনুতাপ প্রকাশ করায় তিনি তাদের মুক্তি দেন।

তবে তিন দিন পর, ২৫ নভেম্বর রাতে আরও বড় অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী নিয়ে ফের হামলা চালানো হয়। দুই স্ত্রীকে পাশে নিয়ে সারারাত যুদ্ধ করেন রহিমুল্লাহ। ভোরে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন।

রহিমুল্লাহ হত্যার ঘটনা তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নজরে আসে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তের উদ্যোগ নেন। মামলার আসামিদের কলকাতায় নিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। হেনরি মোরেল বোম্বে থেকে এবং দুর্গাচরণ বৃন্দাবন থেকে গ্রেপ্তার হন। রবার্ট মোরেল অসুস্থ অবস্থায় বরিশালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ১৮৬৮ সালের ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন।

রহিমুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর মোরেল পরিবারের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পায়। পরবর্তীতে তাদের অনুসারীরা রবার্ট মোরেলের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। সেখানে সাদা পাথরে তার মৃত্যু ও নির্মাতাদের নাম খোদাই করা রয়েছে। তবে স্মৃতিস্তম্ভটিরও বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও চুরি হয়ে গেছে।

বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটি সভাপতি এসএম সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, কুঠিবাড়ি শুধু একটি ভবন নয়, এটি মোরেলগঞ্জের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন অবহেলায় এটি ধ্বংসের পথে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে এনে দ্রুত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, কুঠিবাড়ি সংরক্ষণের বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে কৃষ্ণচূড়া গাছ রোপণ এবং বিনোদনকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও চিন্তাভাবনা রয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)