রাব্বি আল-আমিন
, যশোর
ইউরোপের একটি দেশে পাড়ি জমিয়ে ভাগ্য বদলাবেন- এমন স্বপ্ন নিয়ে পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করেন দেলোয়ার হোসেন।
কিন্তু জমি বিক্রির সেই সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়ে চম্পট দেয় দালাল। নিঃস্ব ও দিশেহারা হয়ে পড়েন দেলোয়ার। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পথে বসার উপক্রম হয় তার। জীবন বাঁচানোর তাগিদে কাজের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।
সময়ের পরিক্রমায় সেই দেলোয়ার হোসেন এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। মাছ দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী ও স্বাস্থ্যসম্মত ফাস্ট ফুড বিক্রি করে তিনি এখন প্রতি মাসে আয় করছেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
তার এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার বেকার যুবকরাও এখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
সবকিছু হারানোর পর যখন দেলোয়ার দিশেহারা, তখন পরিচয় হয় উন্নয়ন সংস্থা ‘শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা জামিল হোসেনের সাথে। তিনি তাকে মৎস্যজাত পণ্য তৈরি ও বিপণনের ওপর প্রশিক্ষণের পরামর্শ দেন। এরপর দেলোয়ার সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গিয়ে রেডি টু ইট মৎস্য পণ্য তৈরি ও বিপণন প্রদর্শনীর ওপর তিনদিনের একটি নিবিড় প্রশিক্ষণ নেন।
প্রশিক্ষণ শেষে পিকেএসএফ’র অর্থায়নে এবং শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের কারিগরি সহায়তায় চৌগাছা উপজেলা পরিষদের দ্বিতীয় গেটের কাছে ডাকবাংলাে রোডে গড়ে তোলা হয় ‘ফাস্টফুড সেন্টার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। একটি আধুনিক ফুডকার্টের মাধ্যমে মাছের তৈরি হরেক রকম পুষ্টিকর খাবার বিক্রি শুরু করেন তিনি।
দেলোয়ার জানান, আগে আলু দিয়ে সিঙ্গারা-পুরি বিক্রি করতেন, যাতে তেমন লাভ হতো না। কিন্তু এখন মাছ দিয়ে তৈরি করছেন ফিস সিঙাড়া, ফিস পুরি, ফিস বল, ফিস বার্গার, ফিস স্যান্ডউইচ ও ফিস ফ্রাই। ফিস বল, ফিস সিঙাড়া ও ফিস পুরি দশ থেকে কুড়ি টাকা। আর ফিস বার্গার, ফিস স্যান্ডউইচ ও ফিস ফ্রাই ৪০ থেকে একশ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় করেন।
তিনি বাজার থেকে ১২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বড় সাইজের তেলাপিয়া, পাঙাস ও সিলভার কার্প মাছ কিনে আনেন। এরপর প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে মাছের কাঁটা আলাদা করে, তা গুঁড়ো করে বেসন ও ময়দার সাথে মিশিয়ে খাঁটি শর্ষেরতেলে ভাজেন। এছাড়া, ক্রেতাদের পছন্দের জন্য জ্যান্ত মাছের লাইভ ফ্রাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে তার দোকানে।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এক সময় বিদেশ যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সব হারালাম। আজ দেশের মাটিতে, নিজের শহরে পরিবার নিয়ে বেশ সুখে আছি। খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা লাভ থাকে। এখানে তিনজন কর্মচারী, তাদেরও সংসার চলছে।’
উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের অবদান স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘তাদের পরামর্শ এবং পিকেএসএফ’র আর্থিক সহযোগিতায় আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, এখানে সবকিছু মাছ দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি করায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ দূর দূরান্ত থেকে খেতে আসে। মূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রাখার চেষ্টা করি। খাদ্য সামগ্রীতে তেলাপিয়া, পাঙ্গাস ও সিলভার কার্প মাছ বেশি ব্যবহার করি। একদিকে আমিষের চাহিদা মেটে আবার খেতেও সুস্বাদু।
খুলনা থেকে ব্যবসায়িক কাজে চৌগাছায় আসা ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘এখানে এলেই মাছের ফাস্টফুড খাই। আগে আলুর সিঙাড়া খেতাম, এখন সেই দামে মাছের সিঙাড়া-পুরি পাচ্ছি। খাবারগুলো সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।’
দেলোয়ারের সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে চৌগাছার মান্দারতলা গ্রামের আকাশ নামে এক তরুণও এই ব্যবসা শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, ‘দেলোয়ার ভাইয়ের পরামর্শ নিয়ে গ্রামে ফাস্টফুড রেস্টুরেন্ট দিয়ে তিনি এখন দারুণ লাভবান হচ্ছেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের এলাকার মানুষজন খেতে আসে। ব্যবসা অনেক ভালো চলছে।’
শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা জামিল হোসাইন বলেন, ‘চৌগাছায় আমরা এই মৎস্যজাত পণ্যের প্রদর্শনীটি করেছি। আগে ফাস্টফুডের নামে জাঙ্ক ফুড খেতো, যা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতো। কিন্তু মাছের তৈরি এই খাবারে প্রচুর প্রোটিন রয়েছে। বিশেষ করে যে শিশুরা মাছ খেতে চায় না, তাদের আমিষের চাহিদা পূরণে এটি দারুণ ভূমিকা রাখছে।’
‘রেডি টু ইট মৎস্যজাত পণ্য হলো রান্না করা বা প্রক্রিয়াজাত ছাড়াই একজন ভোক্তা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে। বর্তমানে তাজা মাছের পাশাপাশি রেডি টু ইট আমাদের দেশের খাদ্য তালিকায় যুক্ত হয়েছে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘দেশি মাছ দিয়ে ফাস্টফুড তৈরি করা নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। তবে, এক্ষেত্রে মাছ কাটার স্থান ও সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্যবিধি এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে আমাদের নিয়মিত তদারকি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।’
দেলোয়ার হোসেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার ডাকবাংলাে রোড এলাকার বাসিন্দা।