বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
দোকানের নাম ‘১৯৭২ আ. হান্নান ভাজার দোকান’। দেখলেই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, দোকানের নাম এমন কেন! কথা বলে জানা যায়, ১৯৭২ সালে তসবির মহলের পাশে ড্রেনের উপরে ক্ষুদ্র এই ব্যবসা শুরু করেন আ. হান্নান। তাই, দোকানের নামটি এমন রেখেছেন।
আব্দুল হান্নানের এই দোকানটি যশোর শহরে, ইনস্টিটিউটের ঐতিহাসিক বি. সরকার মেমোরিয়াল হল (তসবীর মহল নামে সমধিক পরিচিত) সংলগ্ন মার্কেটে।
ভাজার দোকান মানে, এখানে বিক্রি করা হয় ছোলা, পেঁয়াজু, বিভিন্ন ধরনের চপ। ১৯৭২ সাল থেকে আব্দুল হান্নান এই তল্লাটে ছোটখাট ব্যবসা করে আসছেন।
৭১ বছর বয়সী আব্দুল হান্নান এখনও সুঠাম দেহের অধিকারী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি যশোরের বেনাপোলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে খাবার রান্না করতেন, তখন তার তরুণ বয়স।
স্মৃতি হাতড়ে হান্নান বলেন, ১৯৭২ সালে তখন যশোর পৌরসভার নির্বাচনের ডামাডোল। সেই সময় এইখানে তরিকুল ভাই তার নির্বাচনি অফিস করেছিলেন। তরিকুল ভাই, মানে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী যশোরের জনপ্রিয় রাজনীতিক প্রয়াত তরিকুল ইসলাম। অবশ্য, সেইসময় তিনি বামপন্থি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন। সেই নির্বাচনে তরিকুল ইসলাম যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আর চেয়ারম্যান ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির (লেনিনবাদী) নেতা ভাষাসৈনিক আফসার আহমেদ সিদ্দিকী।
আব্দুল হান্নান বলেন, ‘‘তখন এখানে কাঁচা ড্রেনের উপরে খাট বিছিয়ে চা আর বনরুটি বিক্রি করতাম। তরিকুল ভাই বললেন, ‘তুই এখানে (এখন যেখানে আছি) চা বানাবি আর আমাদের খাওয়াবি।’ তিনি সেইসময় বেশ দামি ছয়টি কাপ ও পিরিচ কিনে দিয়েছিলেন, যাতে তাদের চা দিতাম। জমজমাট ওই নির্বাচনি অফিসে খালেদুর রহমান টিটো, মাহবুবুর রহমান খোকন ভাইরা নিয়মিত বসতেন। আলী রেজা রাজু দাদা মাঝেমধ্যে আসতেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘রঙচা ৫০ পয়সা, দুধচা ৭৫ পয়সা, বনরুটি ৫০ পয়সা আর ক্রিমবন এক টাকা দাম ছিল। ওই জায়গার ভাড়া দিতে হতো ৬০ টাকা। তরিকুল ভাই প্রতি সপ্তাহে বিল দিতেন। কখনো একশ’ টাকা আবার কখনো দেড়শ’ টাকা বিল হতো। ভাই, ট্রিপল ফাইভ সিগারেট খেতেন।’’
সেই ১৯৭২ সাল থেকে অদ্যাবধি আ. হান্নান তার দোকানটি সচল রেখেছেন। আগে তিনি নিজে একা সামলাতেন। এখন বয়স তাকে কিছুটা অনিয়মিত করেছে। তিনি এখন সপ্তাহে দুইদিন আর বাকি দিনগুলো দুই ছেলে দেখভাল করেন।
তিনি জানান, ১৯৮৬ সালে টাউন হল মাঠে যাত্রা-সার্কাস মেলায় প্রথম ভাজাপোড়া শুরু করেন। ওইসময় থেকেই নিয়মিত এখানেও ভাজা পোড়া বিক্রি। ৫০ পয়সা দামের বেগুনি, আলুর চপ, পেঁয়াজু, ৫ টাকায় ইলিশ মাছের ডিমের চপ, হাঁসের ডিমের চপ আর তেলেভাজা ছোলা বানাতেন।
তখন অবশ্য জিনিসপত্রের দামও কম ছিল, যেমন ছোলা, বেসন ইত্যাদি ১২ টাকা আর তেল ছিল ২৬ টাকা।
ব্যবসা সেই থেকে চলছে, কিন্তু খেয়ে-পরে আর কিছুই জমানো যায়নি। ১৯৮৫ সালে দোকানের ভাড়া দিতে হতো সাতশ’ এখন ১২শ’।
দিনবদলের সাথে সাথে জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে জানিয়ে আ. হান্নান বলেন, এখন দশ টাকায় খাসির কিমা চপ, মাশরুম চপ, ডিম চপ, আলুপুরি আর পাঁচ টাকায় পেঁয়াজু, ফুলোরি, আলুর চপ, রসুন চপ, বেগুনি এবং ছোলা ভাজা থামকো বিক্রি করি।
যশোর শহরের মুজিব সড়কে প্রেসক্লাবের পাশে গলির ভেতরে দুই শতক জমির উপরে ছোট্ট একটি ঘরে আ. হান্নানের বসবাস। তার বাবার নাম মোহাম্মদ সিদ্দিক।
স্ত্রী গত হয়েছেন প্রায় ২৫ বছর আগে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড়ছেলে আলাদা থাকে, বড় মেয়ে শ্বশুরবাড়ি আর তিন ছেলেমেয়ে এবং নাতি-পুতনি নিয়ে কোনোমতে চলছে তার সংসার।