রূপক মুখার্জি
, লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধি
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী বৈশাখী খাতুন (১৮)। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। হাঁটার সময় পা দুটো হাঁটুর নীচ থেকে বেঁকে যায়। এ জন্য তাকে এঁকেবেঁকে চলাফেরা করতে হয়। দেখলে মনে হয় হাঁটতে গেলেই পড়ে যাবেন। এভাবেই নানা প্রতিকূলতায় কেটেছে তার স্কুল ও কলেজ জীবন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা দরিদ্রতা- কোনোটা থামাতে পারেনি বৈশাখী খাতুনকে। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি।
শারীরিক প্রতিবন্ধী বৈশাখী নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামের মো. মন্নু মোল্যা ও ডালিম বেগমের মেয়ে। মাইজপাড়া ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন তিনি। এর আগে তিনি মাইজপাড়া কেডিএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৈশাখী শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতারই শিকার নয়, অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। অভাব অনটনের যাঁতাকলের মধ্যে দিয়ে তাদের সংসার চলে।
বৈশাখীর বাবা মো. মন্নু মোল্যা বলেন, 'আমার কোনো আবাদি জমি নেই। সমিতি থেকে লোন উঠায়ে দুই শতক জমি কিনিছি। তার কিস্তির টাকা শোধ করে আবার লোন নিয়ে একটি খুপড়ি ঘর তুলে সেখানে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনো রকম থাকি। ভ্যান চালায়ে যা ইনকাম হয়, তা দিয়ে সংসার চালাই আর সমিতির কিস্তি দিই। বৈশাখী পড়াশোনায় খুব ভালো। অভাবের কারণে তাকে ভালো করে পড়াতে পারি না। অভাবের কারণে আমার ছোট ছেলেটাও পড়াশোনা ছাড়ান দেছে। অনেক কষ্ট করে মেয়েটারে এই পর্যন্ত পড়ায়ে আনিছি, আমি আর পাইরে দিচ্ছিনে। আমার মেয়েটা একা চলতি পারে না। কেউ যদি আমার মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতো, তাহলে মেয়েটা ভালোভাবে লেখাপড়া করতি পারতো।'
মা ডালিম বেগম বলেন, 'আমার মেয়ের পড়াশোনায় খুব আগ্রহ। কিন্তু অভাবের সংসারে তাকে আমরা ভালোভাবে পড়াতে পারি না। ঠিকমতো বইখাতা কিনে দিতে পারি না। একটা প্রাইভেটও পড়াতে পারি না। সে নিজে থেকে তার সহপাঠীদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে, আবার কখনও খাতায় নোট করে এনে পড়াশোনা করে। আমরা এমনিতেই অনেক গরিব মানুষ তারপর আবার মেয়েটা শারীরিক প্রতিবন্ধী। যদি সমাজের বিত্তবানরা আমার মেয়ের পড়াশোনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতো, তাহলে মেয়েটা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতো।’
বৈশাখী বলেন, 'আমি লেখাপড়া করে শিক্ষক হতে চাই। জীবনে আমার অনেক স্বপ্ন। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে জীবনে ভালো কিছু একটা করতে চাই। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।'
মাইজপাড়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সূচিন্দনাথ মন্ডল বলেন, 'বৈশাখী খাতুন মেধাবী ছাত্রী। সে পড়াশোনায় খুব ভালো। শারীরিক প্রতিবন্ধী ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় আমি তাকে কিছু কিছু বইসহ যতটুকু সম্ভব তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। বৈশাখী যদি শিক্ষার পরিবেশ পায়, আমার বিশ্বাস তাহলে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।'
নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির বলেন, 'শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বৈশাখী খাতুনকে থামাতে পারেনি। তার সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য মনোবল অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। উপজেলা প্রশাসন সবসময় তার পাশে থাকবে এবং সে যেন উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, সেই প্রত্যাশাই কামনা করি।'