ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
‘লোকে অনেক কথাই বলে। বাইরে কেন কাজ করছি- তা নিয়ে উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে। কিন্তু লোকের কথায় কান দিলে তো পেট চলবে না। কারো কাছে হাত পাতছি না, পরিশ্রম করছি জীবিকার জন্যে...’ দৃঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন যশোরের মুড়লি মোড়ে ফুড কার্টের উদ্যোক্তা প্রিয়াঙ্কা।
এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করা প্রিয়াঙ্কার বিয়ে হয় চার বছর আগে। দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সংসার। স্বামী আগে একটি গ্যারেজে কাজ করলেও পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে কিছুদিন তিনি কর্মহীন। এই কঠিন সময়ে ঘরের কোণে বসে না থেকে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রিয়াঙ্কা।
সুপ্রভাতী এনজিওর সহায়তায় মুড়লি মোড়ের জোড়া মন্দিরের বাঁ পাশে শুরু করেছেন একটি ফাস্টফুডের ব্যবসা।
বিকেলে ফুড কার্টটিতে গিয়ে দেখা যায়, বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। বার্গার, ফুচকা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সবজি রোল, পাস্তা, মোমো, মিট বক্স ও পিঠাসহ হরেক রকমের আইটেম সাজানো।
প্রিয়াঙ্কা জানান, শহরের নামী রেস্তোরাঁগুলোর চেয়ে অনেক কম দামে, ঘরোয়া পরিবেশে সম্পূর্ণ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এসব খাবার তৈরি। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত চলে বিক্রি। সব খরচ বাদে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ’ টাকা আয়।
স্বপ্ন দেখছেন, পাশে আরেকটি দোকান দিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াবেন।
উদ্যোক্তা তৈরির এই পেছনের গল্প জানতে কথা হয় বেসরকারি সংস্থা সুপ্রভাতীর পরিচালক নার্গিস আশরাফীনের সাথে। তিনি জানান, ১৯৯৭ সালে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত হয়ে যাত্রা শুরু। এরপর সিসিডিবি, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে সংগঠনটি। ২০০৭ সাল থেকে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের সাথে।
নার্গিস আশরাফীন বলেন, যুব সমাজ ও নারীদের স্বাবলম্বী করতে আমরা পাঁচটি ফুড কার্টের এই বিশেষ প্রজেক্ট হাতে নিই। আমাদের মূল লক্ষ্য- শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণী ও নারীদের আত্মনির্ভরশীল করা।
উদ্যোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা (ন্যূনতম এসএসসি বা এইচএসসি), আচরণ এবং পারিবারিক সদিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। শুরুতে সংস্থার সহায়তায় এবং পরবর্তীতে নিজস্ব বিনিয়োগে চার বছরের চুক্তিতে এই ফুড কার্টগুলোর মালিকানা পুরোপুরি উদ্যোক্তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে মুড়লি মোড় ও বকচরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি স্টল চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
নারীদের ঘরের বাইরে এনে উদ্যোক্তা করার ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে জানিয়ে নার্গিস আশরাফীন বলেন, যশোরের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের এককভাবে বাইরে এনে দাঁড় করানোটা এখনো বেশ কঠিন। অনেক সময় মেয়েরা আগ্রহী হলেও পরিবার, বিশেষ করে বাবারা পিছটান দেন। তবে এই জড়তা কাটতে শুরু করেছে। প্রিয়াঙ্কার মতো মেয়েরা আজ উদাহরণ তৈরি করছে।
দরিদ্র বা অসহায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ চালাতে সুপ্রভাতীর সাথে যুক্ত হতে চাইলে সুযোগ রয়েছে।
লোকলজ্জা আর সামাজিক বাধা জয় করে প্রিয়াঙ্কার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আজ যশোরের অন্য নারীদের জন্যও এক বড় অনুপ্রেরণা।