বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
বাবা-মায়ের স্মৃতি ধরে রাখাসহ বেশকিছু কারণে শহরের গা ঘেঁষে যশোর সদরের ধর্মতলা এলাকায় ভিন্নরকম একটি কৃষি ফার্ম গড়েছেন তার সন্তানরা।
এই কৃষি ফার্মে শুধুমাত্র আমগাছই আছে ৭৫ প্রজাতির। আর দেশি ফল কাঁঠাল, জাম, লিচু, সফেদা, তাল, খেজুর, বেল, ফলসা- কী নেই সেই বাগানে!
ছোট্ট দুটো পুকুরে চাষ করা হচ্ছে মাছ। রুই, কাতল, মৃগেলের পাশাপাশি কার্পজাতীয় মাছ তো রয়েছেই, সাথে সাথে মিলছে পুঁটি, খলসে, শিং, কৈ, মাগুর, টেংরা, সরপুঁটি- সব। আছে পাতিহাঁস, রাজহাঁস আর দেশি মুরগিও।
মহাসড়ক আর রেল লাইনের মধ্যবর্তী স্থানে ছয় বিঘার বেশি জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে আমগাছের ছোটখাট একটি রাজ্য। যেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮শ’ আমগাছ রয়েছে। অনেক গাছে ঝলমল করছে রঙবেরঙের দেশি-বিদেশি আম।
‘অ্যাডামস অ্যাগ্রো ফার্মে’ নামে এই কৃষি ফার্মের উদ্যোক্তা ও পরিবারের ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ এসব তথ্য দিয়েছেন।
বাড়ির পেছনে রয়েছে দুটি ছোট-বড় পুকুর, সেখানে সাঁতার কাটছিল পাতিহাঁস ও রাজহাঁস। বাম ও ডান পাশে বিশাল আমবাগান। সেখানে সারিবদ্ধভাবে লাগানো দেশি ও বিদেশি প্রজাতির আমগাছ। আর বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে নারকেল, খেজুর, জাম, লিচু, সফেদা, বেল, কতবেল, কলা, আখ ইত্যাদি।
ফার্মের প্রবেশপথের ডানপাশের বাগানটিতে প্রথমে আমগাছের চারা লাগানো হয়- জানান আব্দুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন ১৯৮৮ সালে।
তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যখন তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেন, তখন তার কর্মরত প্রতিষ্ঠানের পাশে ব্র্যাকের নার্সারিতে নানা জাতের ফলের চারা দেখেন। সেইসময়ই তিনি মন স্থির করেন বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজ ভিটায় একটি ফার্ম করার। বড়ভাই হর্টিকালচারিস্ট, বিষয়টি তাকে জানালে তিনিও সায় দেন। তখন ওই নার্সারি থেকে ইনডিয়ান তোতাপুরি, তোষা, আমেরিকান কেন্ট, অস্ট্রেলিয়ান আরটুইটু, সিমওয়ান, মেক্সিকান পালমার, হাইব্রিড গোপালভোগ, আলফানসো, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, মালয়েশিয়ান প্রভৃতি প্রজাতির ২৫ থেকে ৩০পিস চারা কিনে সেগুলো পাঠাই। এরপর বাড়িতে এসে সেগুলো রোপণ করেন। ওই মাদারগাছ থেকে এখন বহু গাছের জন্ম হয়েছে। যার কলম তিনি নিজেই দেন।
আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসেন মাসুদের বাবার নাম আবুল হোসেন, মা বেগম জাহান আরা। বাবা যশোর জেলা মৎস্য অফিসার ছিলেন। ওই দম্পতির ৬ ছেলে। বড়জন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি উদ্যানতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ মো. ফারুক, মেঝজন আমেরিকাপ্রবাসী কোল্ড চেইন স্পেশালিস্ট ড. এসএম হোসেন শহীদ, সেঝজন ডা. কর্নেল (অব.) এসএম হোসেন শহীদ, চতুর্থজন ব্রি. জেনারেল (অব.) ডা. এসএম হোসেন সা’দ, পঞ্চমজন ব্যবসায়ী এসএম হোসেন সাঈদ এবং শেষেরজন চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পরামর্শক আব্দুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ।
পৈতৃক জমি ছিল প্রায় ২৫ কাঠার মতো। পরে আব্দুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদরা সব ভাই মিলে আরও জমি ক্রয় করেন। বর্তমানে এই ফার্মে জমির পরিমাণ ছয় বিঘার কিছু বেশি। দুটি পুকুর দেড় বিঘা ও দশ কাঠার একটু বেশি। একতলা বাড়ি ৫-৬ কাঠার মধ্যে এবং বাকি সবটুকুই বাগান।
এই বাগানে আম্রপলি, ল্যাংড়া, বারি-৪, বারি-১১, খিরসা, রাণীপছন্দ, গৌরমতি, ইনডিয়ান তোতাপুরি, চোষা, অরুণিমা, আলফানসো, সুরিয়া, জরদালু, কেশর, সিইটু, দশোরি, পাকিস্তানি চোষা, নামফোকলাই, ইয়েলো, গ্রিন, ডকমাই, থাই হোয়াইট, চিলিম্যাংগো, হাড়িভাঙ্গা, আমেরিকান কেন্ট, থাই কাটিমন, চিয়াংমাাই, রেড আইভরি, নীলাম্বরি, সিমন, মল্লিকা, মিয়াজাকি, সুইট টার্ট, চিয়াংমাই, ভেনাস গ্লেন, নাগ ফজলি, রেড চিয়াংমাইসহ নানা প্রজাতির আম। এছাড়া দেশি ফলের মধ্যে জামা, কাঁঠাল, লিচু, লেবু, সফেদা, বরই, বেল, কতবেল, জলপাই, খেজুর, তাল, পেয়ারা, করমচা, ফলসা, গাব- এমনকী আপেল গাছও রয়েছে।
পুকুরে চাষ হচ্ছে সব ধ:রনের মাছ, যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙাস, সরপুঁটি, থাই সরপুঁটি, শিং, মাগুর, কই, বাইন প্রভৃতি।
ফার্মে রয়েছে একশ’ পাতি হাঁস, রাজহাঁস ১৯টি এছাড়া দেশি মুরগি সবমিলিয়ে তিনশ’য়ের বেশি।
উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ বলেন, বাবা-মায়ের স্মৃতিচিহ্ন অটুট রাখতে এই অ্যাগ্রো ফার্মটি করেছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- ফলদ উদ্ভিদের দেশি-বিদেশি জাত ও প্রজাতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, শিক্ষামূলক প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ, নির্বাচিত জাতের নার্সারি উন্নয়ন ও চারা বিপণন, উৎপাদিত ফল অভ্যন্তরীণ বাজার ও বিদেশে রপ্তানি এবং সর্বোপরি পিতা-মাতার সম্পত্তি সংরক্ষণ ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং তাদের আদর্শ সমুন্নত রাখা।
যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক দীপঙ্কর দাশ বলেন, যশোরে এতো বৈচিত্র্যময় আমের জাতের বাগান আর কোথাও নেই। সেখানে ৭৫ প্রজাতির আমগাছ আছে, আমাদের সেন্টারে ৫৩ প্রজাতি। উনি বিভিন্ন স্থান থেকে এসব চারা সংগ্রহ করেছেন। তাকে গ্রাফটিং, পেস্টিসাইড ব্যবহার, সার প্রয়োগ ইত্যাদি প্রযুক্তিগত সহায়তা করে থাকি।