যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

শোল মাছের গ্রাম

এম জালাল উদ্দীন

, পাইকগাছা (খুলনা)

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন,২০২৬, ১১:০০ এ এম
শোল মাছের গ্রাম

শোল মাছ চাষের এক অনন্য সফল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে খুলনার পাইকগাছার বাদুড়িয়া গ্রাম। এক সময়কার সাধারণ এই জনপদ আজ শোল মাছ উৎপাদনের কারণে নতুন পরিচয়ে পরিচিতি। গ্রামের শত শত ছোট-বড় পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে শোল মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন শতাধিক পরিবার। স্থানীয়দের অনেকেই এখন বাদুড়িয়াকে ‘শোল মাছের রাজধানী’ বলেই ডাকেন।

উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের বাদুড়িয়া গ্রামে প্রায় তিন শতাধিক পুকুরে শোল মাছ চাষ হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এ খাতের সঙ্গে জড়িত। মাছ চাষে ঝুঁকছেন যুবক থেকে বৃদ্ধরাও। বাড়ির আঙিনার ছোট পুকুর থেকে শুরু করে মাঝারি আকারের জলাশয়-সবখানেই চলছে শোল মাছের নিবিড় চাষ। মাছের খাদ্য প্রস্তুত, পুকুর পরিচর্যা ও বিপণনকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য।

প্রতিটি পুকুরের চারপাশ বাঁশের চটা ও বিশেষ নেট দিয়ে ঘিরে সুরক্ষিত করা হয়েছে। এতে পুকুরগুলো যেমন পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন দেখায়, তেমনি মাছ চাষের জন্যও তৈরি হয়েছে নিরাপদ পরিবেশ। এ ব্যবস্থার ফলে সাপ, ক্ষতিকর পোকামাকড়সহ অন্যান্য অবাঞ্ছিত প্রাণী পুকুরে প্রবেশ করতে পারে না, যা শোল মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েকবছর আগেও গ্রামের অনেক মানুষ বেকার কিংবা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু শোল মাছ চাষে সাফল্য আসার পর তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে অনেক পরিবার এই মাছ চাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন। নতুন উদ্যোক্তারাও আগ্রহ নিয়ে এ খাতে যুক্ত হচ্ছেন।

চাষিরা জানান, অধিকাংশ পুকুরের আয়তন ৫ থেকে ৬ শতক। এসব পুকুরে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত শোল মাছের পোনা ছাড়া হয়। খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে কাঁচা তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে দেওয়া হয়। একটি পুকুরে দৈনিক প্রায় এক মণ পর্যন্ত মাছ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাছের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের পরিমাণও বাড়ানো হয়।

শোল মাছ চাষে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। প্রতিদিন ভোর থেকে গৃহিণীদের মাছের খাদ্য প্রস্তুত করতে দেখা যায়। তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে খাদ্য তৈরির কাজ এখন বাদুড়িয়া গ্রামের নিত্যদিনের দৃশ্য।

স্থানীয় মৎস্যচাষি মো. হাসান বলেন, ‘মাত্র ছয় শতক আয়তনের একটি পুকুরে দুই হাজার ৬০০ শোল মাছের পোনা ছেড়ে চাষ শুরু করি। সাত থেকে আট মাসের মধ্যে মাছের ওজন ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত হয়। বছরে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়, আর বিক্রি করি সাত থেকে আট লাখ টাকার মাছ। ফলে ভালো লাভ থাকে।’

তিনি জানান, পাশের খাল-বিল থেকে সংগ্রহ করা পোনাগুলো প্রথমে মশারি বা বিশেষ নেটের ভেতরে কিছুদিন লালন-পালন করা হয়। পরে উপযুক্ত আকার ধারণ করলে মূল পুকুরে ছাড়া হয়।

আরেক সফল চাষি উজ্জ্বল গাজী বলেন, ‘গত বছর ১৫ শতক আয়তনের দুটি পুকুরে দুই হাজার ৬৭০টি শোল মাছ চাষ করে প্রায় নয় লাখ দশ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছি। খরচ হয়েছিল প্রায় চার লাখ টাকা। এ বছর সাড়ে চার হাজার পোনা ছেড়েছি। আশা করছি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারবো।’

প্রায় ছয় বছর ধরে সফলভাবে শোল মাছ চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে জানান এই চাষি।

স্থানীয়দের দাবি, বাদুড়িয়ার উৎপাদিত শোল মাছ এখন পাইকগাছার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি শোল মাছ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় চাষিরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। ফলে দিন দিন এ চাষের পরিধিও বাড়ছে।

গ্রামবাসীর ভাষায়, একসময় যে পুকুরগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকত, আজ সেগুলোই হয়ে উঠেছে আয়ের প্রধান উৎস। শোল মাছ চাষই এখন বাদুড়িয়ার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক বলেন, ‘এলাকার মানুষ জীবিকা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মৎস্য খাতের এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি শোল মাছ চাষের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা মূল্যায়নে আমরা শিগগিরই এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করবো।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)