যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মায়ের দৃঢ়তায় আজ খুবির প্রভাষক সাইফুল্লাহ মুনছুর

শাম্মী আক্তার মিথি

, খুবি

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন,২০২৬, ০১:০০ এ এম
মায়ের দৃঢ়তায় আজ খুবির প্রভাষক সাইফুল্লাহ মুনছুর

সাইফুল্লাহ মুনছুর। চলতি মাসের প্রথমদিকে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিসিপ্লিনের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার আছে অনেক গবেষণাপত্র, প্রতিষ্ঠিত একজন গবেষক তিনি।

এ বছরের একুশে বইমেলায় ‘দাঁড়িকমা’ প্রকাশনী থেকে তার কবিতার বই ‘তোমার শহরে কারফিউ’ প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি মাস্টার্সে করা গবেষণাকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করারও চেষ্টা করছেন।

অনার্সে থাকাকালে তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ উপন্যাস নিয়ে কাজ করেন। সেই গবেষণা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক অনুষদের জার্নালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের উপন্যাসে মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রভাব নিয়ে কাজ করেন। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শওকত ওসমান ও আহমদ ছফার উপন্যাস নিয়েও গবেষণা করেছেন। এখন বাংলাদেশের উপন্যাসে মিথ ও কিংবদন্তির রূপায়ণ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা চলছে।

এই প্রতিভাবান ব্যক্তির আজকের এই অবস্থান কিন্তু খুব সহজেই ধরা দেয়নি। তার পথচলার শুরুটা ছিল বন্ধুর। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পাওয়ায় দরিদ্র বাবা তার পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়াকে ‘অপচয়’ মনে করেছিলেন। সেকারণে শ্রমিক ভিসায় তাকে মালয়েশিয়া পাঠানোর বন্দোবস্তও করেন। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী মা সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে দারুণ ভূমিকা নেন। শুরু হয় পড়াশোনার নতুন অভিযাত্রা।

কৃষক পরিবারের সন্তান সাইফুল্লাহ মুনছুর। পড়াশোনা ও বেড়ে উঠা গ্রামেই। এসএসসিতে জিপিএ৫ পাবেন- এমন আকাক্সক্ষা থাকলেও ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল, জিপিএ-৪.৮৮।

সাইফুল্লাহ মুনছুরের ছেলেবেলা কেটেছে প্রত্যন্ত এক গ্রামে। যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারন ইউনিয়নের আমিনী রামচন্দ্রপুর গ্রামে। পড়ালেখা শুরু গ্রামের মাদরাসায়। পড়ালেখায় খুব বেশি আগ্রহ ছিল না, কিন্তু পরীক্ষায় বরাবরই ভালো করতেন, দেখা যেত পজিশন এক বা দুইয়ের মধ্যেই।

সাইফুল্লাহ মুনছুর বলেন, ‘ক্লাস এইটে পড়ি, তখন পরিবারের সিদ্ধান্তে গ্রামের বাইরে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। পাশের উপজেলার বুরুজবাগান হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু গ্রাম থেকে দূরে গিয়ে পড়তে ভালো লাগতো না। দশ দিন সেখানে ক্লাস করার পর আবার মাদরাসায় ফিরে আসি। পরিবার ছিল নিম্নবিত্ত। বড় ভাই পড়ালেখা করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, নৃবিজ্ঞান বিভাগে।’

‘এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমার জন্য একটা ধাক্কা। কারণ, নিজের ও পরিবারেরও আশা ছিল- আরও ভালো করবো,’ বলেন তিনি।

ফলাফল আশানুরূপ না হওয়া এবং পরিবারের আর্থিক দিক বিবেচনা করে বাবা এসময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার বিষয়টা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থায় পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মা খুব শক্ত অবস্থান নেন। এছাড়া বড় মামা এবং মামাতো ভাইয়েরা যথেষ্ট সহযোগিতা করেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথমদিকে মনে হয়নি তাকে শিক্ষক হতে হবে বা খুব ভালো ফলাফল করতে হবে। বরং ক্যাম্পাসের সংস্কৃতিই তাকে বেশি টানতো। সিনিয়রদের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটাতেন। অনেক রাত করে হলে ফিরতেন। পুরো ছাত্রজীবনে তিনি ক্যাম্পাসে, মাঠে-ঘাটে, বন্ধুদের সঙ্গে অনেক বেশি সময় দিতেন। প্রথম কয়েকটি সেমিস্টারে ফলাফল খুব একটা ভালো হয়নি।

তিনি বলেন, ‘পরে মনে হলো, নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়া দরকার। বড় ভাই বারবার বলতেন চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। যখন শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন থেকে আমার লক্ষ্য ছিল একটাই। যেকোনো মূল্যে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে। পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হই। মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। এরপর খুব দ্রুতই আমার পরিশ্রমের ফল পাওয়া শুরু।’

তরুণদের প্রতি সাইফুল্লাহ মুনছুরের বার্তা- শুধু বইয়ের জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। জীবনকে জানতে হবে, মানুষকে জানতে হবে। মানুষের সঙ্গে মিশে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, শুধু বই পড়ে সেই শিক্ষা সবসময় পাওয়া সম্ভব নয়। এই জীবনকথা আসলে ব্যর্থতা ও সাফল্যের সরল বিভাজন নয় বরং ধারাবাহিক শিক্ষা, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাসের এক বাস্তব চিত্র। এখানে প্রতিটি ধাপে দেখা যায় পরিবেশ, পরিবার এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে একজন মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো, বড় স্বপ্ন একদিনে পূরণ হয় না; তা গড়ে ওঠে ছোট ছোট চেষ্টা, নিয়মিত পরিশ্রম এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)