নুসরাত জাহান লিরা
, ইবি
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন। সহপাঠীরা চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে একের পর এক শব্দ। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের এক কোণে বসে থাকা তরুণটির চোখ সেই লেখা স্পষ্টভাবে দেখতে পায় না। শক্তিশালী চশমাও তার সীমিত দৃষ্টিশক্তিকে পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে পারেনি। তবু মনোযোগে কোনো ঘাটতি নেই। শিক্ষক যখন ইংরেজি সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কান পেতে শুনে যান প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ব্যাখ্যা। কারণ, চোখের আলো ম্লান হলেও মনের আলো নিভে যায়নি তার।
তিনি তারিফ মেহমুদ চৌধুরী। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইংরেজি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। জন্মগতভাবে জটিল চক্ষুরোগে আক্রান্ত এই তরুণ দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতাকে কখনোই নিজের স্বপ্নের সীমা হতে দেননি। সাহিত্যপ্রেম, সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং অসাধারণ মানসিক শক্তিকে সঙ্গী করে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের গন্তব্যের দিকে।
রাজবাড়ী জেলার বেলগাছি গ্রামের চার সদস্যের একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তারিফ। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ছোট ভাই দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। তার শিক্ষাজীবনের সূচনা মায়ের কর্মস্থল হাটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে বিলগেটশা আলিমুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকার নটরডেম কলেজে।
গ্রাম থেকে রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে মানিয়ে নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ-সবকিছুই ছিল অপরিচিত। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস সময় লেগেছিল সেই পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে। তবে পরিবারের নিরন্তর উৎসাহ এবং নিজের দৃঢ় মানসিকতার কারণে ধীরে ধীরে সব বাধা অতিক্রম করেন তিনি।
তারিফ জানান, তার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মা, বাবা এবং মামা পাশে ছিলেন। পাশাপাশি তার খালা, শৈলকূপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রফেসর এ্যামিলি খাতুন, তাকে শুধু পড়াশোনায় নয়, আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। হাতে-কলমে শেখানো থেকে শুরু করে মানসিকভাবে সাহস জোগানো-সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন তারিফের অন্যতম ভরসার জায়গা।
এইচএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৯২ অর্জন করেন তারিফ। ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ ইউনিটে ইংরেজি বিষয়ে সুযোগ না পেলেও ঘ ইউনিটে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ে ছিল ইংরেজি সাহিত্য। সেই স্বপ্নের টানেই গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম শুরু হয়েছিল জন্মের পর থেকেই। জন্মগতভাবে তার কর্নিয়ায় কেরাটোকর্নাস নামের একটি জটিল রোগ রয়েছে। এ রোগে কর্নিয়ার স্বাভাবিক গোলাকার গঠন বিকৃত হয়ে যায়, ফলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চিকিৎসার আশায় তিনি তিনবার ভারতে গেছেন। ভারতের হায়দরাবাদের একটি চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাও নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, তার চোখের জন্য আর কার্যকর কোনো চিকিৎসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই নতুনভাবে জীবনকে সাজাতে শুরু করেন তিনি। এরপর থেকে দৃষ্টিশক্তির ওপর নয়, বরং শ্রবণশক্তি, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করেই এগিয়ে চলেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নতুন পরিবেশে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পেয়েছেন পারিবারিক সহায়তা। বিশেষ করে তার খালু নাসির উদ্দীন, যিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং হলে ওঠাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার পাশে ছিলেন। তাদের সহযোগিতায় নতুন ক্যাম্পাসে দ্রুত নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে সক্ষম হন তিনি।
ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার বীজ রোপিত হয়েছিল নটরডেম কলেজেই। কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আতায়ুল রূপকের অনুপ্রেরণা তার চিন্তার জগৎ বদলে দেয়। স্যারের একটি কথা আজও তারিফের মনে গেঁথে আছে-‘ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি যেখান থেকে, ওখান থেকেই ইংরেজি ভাষা শিখতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম অনুসরণ করাও তার জন্য সহজ নয়। বোর্ডের লেখা স্পষ্ট দেখা যায় না, বই পড়তেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তাই তিনি সহপাঠীদের সহযোগিতা নেন। অডিও ক্লাস, রেকর্ড করা লেকচার, ব্রেইল প্রিন্ট এবং হাতে লেখা নোট-সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছে তার নিজস্ব শেখার পদ্ধতি।
তবে তার পরিচয় কেবল একজন সংগ্রামী শিক্ষার্থী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তিনি পরিচিত মুখ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান পরিবেশন করেন তিনি। মঞ্চে উঠে যখন তিনি গান গেয়ে ওঠেন, তখন তার কণ্ঠের আবেগ আর সুরের মাধুর্যে দর্শক ভুলে যান তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা। সংগীত যেন তার জীবনের শক্তি, সাহস আর আশ্রয়।
তারিফ বিশ্বাস করেন, জীবনে থেমে থাকার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, ‘পিছিয়ে পড়লে চলবে না, এগিয়ে যেতে হবে।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার দীর্ঘ সংগ্রামের সারাংশ।
ভবিষ্যতে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান তিনি। সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার স্বপ্ন। সবার কাছে তিনি দোয়া চান, যেন একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন।
তারিফ মেহমুদ চৌধুরীর গল্প শুধু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সংগ্রামের গল্প নয়; এটি সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার গল্প। এটি প্রমাণ করে, জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি চোখের দৃষ্টিতে নয়, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও মনোবলে।
চোখে আলো না থাকলেও হৃদয়ে যদি স্বপ্ন জ্বলে, তবে সেই আলোই একদিন পথ দেখায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তরুণ আজ সেই আলোরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।