যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পোশাক

শাড়ি অনার্য অবদান

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : রবিবার, ২৬ জুলাই,২০২৬, ১১:০০ এ এম
শাড়ি অনার্য অবদান

শাড়ি ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর পরিধেয় বস্ত্রবিশেষ। ‘শাড়ি’ শব্দের উৎস সংস্কৃত ‘শাটী’ শব্দ থেকে। ‘শাটী’ অর্থ পরিধেয় বস্ত্র। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রাচীন ভারতের পোশাক সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, ‘তখন মেয়েরা আংটি, দুল, হার এসবের সঙ্গে পায়ের গোছা পর্যন্ত শাড়ি পরিধান করত, উপরে জড়ানো থাকত আধনা (আধখানা)। পাহাড়পুরের পাল আমলের কিছু ভাস্কর্য দেখেই তা অনুমান করা যায়।’ এই তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, অষ্টম শতাব্দীতে শাড়ি ছিল প্রচলিত পোশাক।

ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড় পরার রেওয়াজ আদিম কালে ছিল না। এই সেলাইবিহীন অখণ্ড বস্ত্র পুরুষের ক্ষেত্রে ‘ধুতি’ এবং মেয়েদের বেলায় ‘শাড়ি’ নামে অভিহিত হয়। বয়ন শিল্পের উৎপত্তির সঙ্গে শাড়ির সংযোগ রয়েছে। তখন যেহেতু সেলাই করার কৌশল জানা ছিল না, তাই সেলাই ছাড়া টুকরা কাপড় পরাই ছিল শাস্ত্রীয় বিধান। এ সময়ে সেলাই ছাড়া কাপড় পরার রেওয়াজ উপমহাদেশের বাইরেও প্রচলিত ছিল।

আরেক তথ্য মতে, শাড়ি শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ‘শাটী’ হতে। শাটীর অর্থ হলো ‘এক ফালি কাপড়’। পরে এটি প্রাকৃত ভাষার বিবর্তনের কারণে ‘শাডি’ বা ‘সাত্তিকা’ শব্দ হতে ‘শাড়ী’ শব্দে পরিণত হয়েছে। আর এই ‘শাড়ী’ বানানটি বর্তমানে বিবর্তিত হয়ে ‘শাড়ি’ হয়েছে।

শাড়ি শুধু পরিধেয় বস্ত্রই না, শাড়ি বাঙালি জাতির এক গৌরবময় সংস্কৃতির প্রতীক। প্রাচীনকাল থেকে এদেশের বর্ণিল, সূক্ষ্ম ও বাহারি শাড়ির খ্যাতি জগদ্বিখ্যাত। এসব শাড়ি যেন এক একটি ক্যানভাস, এক একটি শিল্পকর্ম। মসলিন, বেনারসি, কাতান, চান্দেরী, জামদানিসহ নানা ধরনের শাড়ি বাঙালি সংস্কৃতির নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে সব সময়।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতীয় উপমহাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম, দর্শন, সভ্যতা ও সংস্কৃতিসমূহের মিলনস্থল। ভিন্ন ভিন্ন নদী যেমন একই সমুদ্রে এসে পতিত হয় তেমনি ভারতের জনজীবনের মহাসমুদ্রে একেকটি নদীর ধারার মতোই এসে মিলেছে আর্য, অনার্য, গ্রিক, শক, হুন, পার্সি, আরব, তুর্কি, চৈনিকসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী। আর সাথে নিয়ে এসেছে তাদের কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির অংশ। এজন্যই ভারতীয় সমাজে পরিলক্ষিত হয় সংস্কৃতি ও রুচির এমন বৈচিত্র্যময় মেলবন্ধন। স্থূল পর্যবেক্ষণে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রধানতম সংস্কৃতি তিনটি। হিন্দুস্তানি (উত্তর ভারত ও বর্তমান পাকিস্তান), কর্ণাটী (দক্ষিণ ভারত) ও পূর্বভারতীয় (বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা)। তবে পূর্বভারতীয় সংস্কৃতি অনেকটাই আর্য হিন্দুস্তান আর অনার্য কর্ণাটী সভ্যতার শংকর। সংস্কৃতির এত ভিন্নতার মধ্যেও যে কয়েকটি মিল রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারীদের পরিধেয় শাড়ি। এই শাড়ি কখনো বাঙালি নারীর সর্বাঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে, কখনো রাজপুতানীর ঘাগরা হয়ে কোমরে শোভা পেয়েছে। কখনো মারাঠি কুমারীর ধুতি হিসেবে পরিহিত হয়েছে।

নারীদের পরিধেয় হিসেবে ভারতে শাড়ির প্রচলন কবে তা ঠিক স্পষ্ট নয়। তেমনি স্পষ্ট নয় শাড়ি শব্দটির উৎপত্তি কোন ভাষা থেকে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী শাড়ি পরার প্রচলন শুরু করে আর্যরা। সে হিসেবে শাড়ির ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরেরও পুরনো। কিন্তু সিন্ধু ও মেহেরগড়ের মতো অনার্য সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে নারীর অঙ্গাভরণ হিসেবে শাড়ির মতো বস্ত্রখণ্ড ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই অনুমান করা যায়, ভারতে সর্বপ্রথম অনার্য অসুর জাতির মধ্যেই শাড়ির প্রচলন শুরু হয়। তখন অনার্যরা সেলাই পদ্ধতি জানতো না। ফলে কালক্রমে অখণ্ড বস্ত্র ধুতি, উত্তরীয় এবং শাড়িই পুরুষ ও নারীদের পোশাক হিসেবে সমাজে স্থান পায়।

শাড়ি শব্দটির উৎপত্তি কোন ভাষা থেকে হয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, সংস্কৃত ‘সত্তিকা’ শব্দ থেকেই শাড়ির উৎপত্তি। তবে অনার্য সভ্যতায় অনেক আগে থেকেই ‘শাটী’ শব্দের প্রচলন পরিলক্ষিত হওয়ায় কেউ কেউ মনে করেন শাটীই শাড়ির মূলশব্দ।

ভারতের একেক অঞ্চলে শাড়ি পরার কায়দা ভিন্ন। উত্তর ভারতে নারীরা শাড়িকে কোমরে কুঁচি দিয়ে গুঁজে ঘাগরা হিসেবে পরেন। মারাঠি রমণীরা ধুতির মতো পা দুটিকে ঢেকে শাড়ির কুঁচিকে কোমরের পেছনে পরেন।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, বেনারসি কারিগরদের পূর্বপুরুষরা মদিনা থেকে মুসলিম শাসনামলে উত্তরভারতের বারাণসী শহরে আগমন করেন। বেনারসি শাড়ির প্রথম কারখানা স্থাপিত হয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের আমলে। মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্প জমজমাট হয়ে উঠে। ভারতভাগের পর অনেক কারিগর বিহার ও অযোধ্যা থেকে পূর্বপাকিস্তানের মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে চলে আসেন। এভাবে বেনারসি শাড়ির ঐতিহ্য বাংলাদেশে আরো গভীর স্থান লাভ করে।

ভারতীয় উপমহাদেশের নারী আর শাড়ির যোগসূত্র হাজার হাজার বছরের পুরনো। বর্তমান যুগে আধুনিকতার ঢেউয়েও শাড়ি ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য।

ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাধারণত শাড়িকে সবচেয়ে উপযোগী পোশাক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে কালের বিবর্তনে বদলেছে শাড়ির পাড়-আঁচল, বুনন এবং পরিধান কৌশল। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, বাঙালি নারীর কাছে শাড়ি তার সারা শরীর জড়িয়ে রাখা এক কাপড়ের একটা দীর্ঘ স্বপ্নখচিত জড়োয়া গয়না। তিনি তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক। শুধু শালীন নয়, রুচিসম্পন্ন, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)