বিজ্ঞান
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
গরমকালে মশা তাড়াতে ঘোড়া তার লেজের ওপর নির্ভরশীল। সেই লেজই শীতকালে কিছুটা হলেও শীত কমাতে সহায়তা দেয়। স্বজাতির কাছে মনের সুখ-দুঃখের কথা ঘোড়া লেজের মাধ্যমেই পাচার করে। ইঁদুরের ঘামগ্রন্থি নেই। এরা লেজের সাহায্যে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
ইগুয়ানার (গুইসাপ জাতীয় প্রাণী) লেজ কাটলেও সমস্যা নেই। ওটা গজায় টিকটিকির লেজের মতো। আসলে লেজে ‘দুর্বল’ মেরুদণ্ড থাকায় বিপদে পড়লে ইগুয়ানা শত্রুর কাছে লেজ জমা দিয়ে ছুটে পালায়। দেহের ভারসাম্য বজায়, দেহে উষ্ণতা দিতে অথবা দেহে ছায়া জোগাতে, মশা ও কীট তাড়াতে, রাডার অথবা আত্মরক্ষার বিশেষ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে, এমনকি ভাব বিনিময় করতে লেজ প্রাণীর প্রয়োজনীয় উপাদান।
কিছু বানর ‘পঞ্চম অঙ্গ’ হিসেবে লেজ ব্যবহার করে। বিশেষত লেজ দিয়ে ওরা গাছের ডাল চেপে ধরে খাদ্য জোগাড় করে হাতের সাহায্যে। শোনা যায়, বিজ্ঞানী ডারউইন নাকি অনেক বছর শুধু লেজের পেছনেই পড়েছিলেন।
বৃক্ষবাসী অপোসামের লেজই অন্যতম ভরসা। লেজ দিয়ে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে থাকতে ওদের জুড়ি নেই। এটা তাদের ‘বাড়তি হাত’ হিসেবে কাজ করে। অবশ্য গরু, ঘোড়া, জিরাফ, জেব্রা এমনকি হাতিও লেজ দিয়ে মশামাছি তাড়ায়। উড়ন্ত পাখি তার গন্তব্য ঠিক রাখতে এবং ওড়ার গতি বজায় রাখতে লেজের শরণাপন্ন হয়।
পেঙ্গুইন উড়তে পারে না, তবে তারা চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু। লেজ না থাকলে এরা সাঁতারকালে দিক পরিবর্তন করতে পারতো না। ময়ূর তার আলো ঝলমল বাহারি লেজ ময়ূরীকে কাছে টানতে ব্যবহার করে।
লেজের ভয়াবহ ঝাপটায় কুমির ও ডলফিন পানিতে দ্রুত সামনে এগুতে পারে। অন্যদিকে র্যাটল স্নেক তার লেজ উঁচিয়ে শত্রুকে শাসানি দিয়ে বলে: ‘বাছাধন, তফাত থাকো। কাছে এলেই খবর আছে।’
রুমালের মতো লেজ নেড়ে হরিণ স্বজাতির কাছে সম্ভাব্য বিপদের সঙ্কেত পাঠায়। কাঁকড়া, বিছে আর কুমিরের লেজ তো রীতিমতো অস্ত্র। উদ তার চেপ্টা লেজের সাহায্যে পানিতে যথাযথ ডুব মেরে মাছ শিকার করে। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো প্রাণীর লেজই ফেলনা নয়। এটা তাদের দেহভাষার কাজও করতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে।
লেজ মাটি স্পর্শ করার পূর্ব পর্যন্ত ক্যাঙ্গারু লাফাতেই পারে না। অথচ পূর্ণবয়স্ক একটি ক্যাঙ্গারু লাফিয়ে তিন মিটার শূন্যে উঠতে পারে। আর লাফ দিয়ে যেতে পারে আট মিটার। শক্তিশালী ও দীর্ঘ লেজ না থাকলে তারা চলন্ত অবস্থায় দেহের ভারসাম্য হারাতো অনায়াসেই।
শেয়ালের কাঁকড়া খুবই পছন্দ। শেয়াল নিজের মোলায়েম অথচ মজবুত লেজখানি কাঁকড়ার গর্তে ঢুকিয়ে দেয় এবং ঘন ঘন নাড়িয়ে কাঁকড়ার মেজাজ বিগড়ে দেয়। উত্তেজিত কাঁকড়া যখনই কামড় বসিয়ে দেয় শেয়ালের লেজে, তখনই শেয়াল আস্তে করে লেজখানি ওপরে তুলে আনে। কাঁকড়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেয়ালের খাদ্যে পরিণত হয়।
বেড়াল শ্রেণির প্রায় সব প্রাণীর বাচ্চাই মায়ের লেজ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়, কীভাবে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। মা বেড়াল বিভিন্ন কৌণিকে সোজা কিংবা উলম্বভাবে লেজখানা নাড়াচাড়া করে, শিশু বেড়াল প্রথম থাবাতেই তা ধরতে চায়। এই সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়েই ছানারা মা থেকে আলাদা হয়ে জীবনযাত্রা শুরু করে। বলা হয়, কুকুরের লেজ নাকি ১২ বছর চুঙ্গায় ঢুকিয়ে রাখলেও সোজা হয় না। এটা সামাজিক আপ্তবাক্য। তবে কুকুরের লেজ ঠিকই সোজা হয়! যখন সে কোনো বলবান কুকুরের বশ্যতা স্বীকার করে কিংবা কোনো কুকুরকে সমীহ করে চলতে হবে, এমন পরিবেশে তার লেজ একেবারে সোজা হয়ে যায়। আবার কুকুর যখন স্বাধীনতা পায় কিংবা দেখতে পায়, আপাতত কোনো উপদ্রব নেই, তখনই লেজখানি বৃত্তাকারে বাঁকা হয়ে যায়।
মাছ লেজের সাহায্যে গতিপ্রাপ্ত হয়। ফলে পানিতে বিচরণ করতে পারে অনায়াসে। কাঠবিড়ালি দৌড়ানোর সময় লেজ দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে। কাঠবিড়ালি তার লোমশ লেজখানা শীতকালে কম¡ল, বর্ষায় ছাতা হিসেবেও ব্যবহার করে।
পাখিরা তাদের সুন্দরের প্রথম প্রকাশ ঘটায় লেজের মাধ্যমে। মোরগের লেজ না থাকলে তাকে মানানসই মনে হতো না। পাখিদের মধ্যে অনেক পাখি এমন রয়েছে যারা তাদের লেজ দেখিয়ে স্ত্রী পাখিকে প্রলুব্ধ করে ও মন দেওয়া-নেওয়া করে। স্ত্রী পাখি তার সঙ্গী বাছাইয়ে প্রথমেই পুরুষ পাখির লেজের আকার, আয়তন ও রং দেখে নেয়। লেজ ছাড়া পাখির জীবন কল্পনা করা যায় না।
দলবদ্ধ শিকারের কারণে নেকড়েরা লেজ বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে উপস্থাপন করে সঙ্গীর কাছে বার্তা পাঠায়, তাকে এখন শিকারের কোন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। পাশাপাশি লেজের অবস্থান দেখে বোঝা যায়, এই শিকারে কোন নেকড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
মানুষের লেজ ছিল কি না, সেটা নিয়ে শেষহীন তর্কে হয়তো মেতে ওঠা যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে লেজবিহীন মানুষ দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি লেজওয়ালা পাখিও দেখতে সুন্দর, লেজযুক্ত মাছও সুন্দর।