রাব্বি আল-আমিন
, যশোর
সরকারি অনুদান নিতে আপত্তি নেই, কিন্তু রাষ্ট্র ঘোষিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালনে অনীহা। যশোরের অধিকাংশ সাংস্কৃতিক সংগঠনের এমন অবস্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুদান গ্রহণের পরও সরকারঘোষিত ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এ এসব সংগঠনের অধিকাংশের কোনো কর্মসূচি ছিল না; এমনকি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও দেখা যায়নি তাদের।
এ ঘটনায় স্থানীয় জুলাইযোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় অনুদান গ্রহণ করা হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত দিবস পালনে অনীহা কেন?
অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। কারও দাবি, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কোনো চিঠি বা আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আবার কেউ কেউ সরাসরি জানিয়েছেন, তারা ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবেই মানেন না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোর জেলায় কাগজে-কলমে প্রায় ৬০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে অর্ধেকের কিছু বেশি সংগঠন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বিবর্তন যশোর, তির্যক, সুরধুনী, সুরবিতান, থিয়েটার ক্যাম্পাসসহ জেলার অধিকাংশ সক্রিয় সংগঠন প্রতিবছর সরকারি অনুদান পেয়ে থাকে।
কিন্তু সরকারের ঘোষিত ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে এসব সংগঠনের কোনোটিকেই জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়নি। অথচ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৫ আগস্টসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আয়োজনে এসব সংগঠনের অনেকগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বরাদ্দ সাড়ে ২৯ লাখ, কর্মসূচিতে শূন্য
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা শাখা ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে যশোর জেলার ৫৮ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্য নয় লাখ ৭১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪১টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য ১৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। দুই খাতে মোট অনুদানের পরিমাণ ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে প্রতিবছরের মতো এবারও ব্যক্তি ও সংগঠন- উভয় পর্যায়ে এই অনুদান দেওয়া হয়।
জেলার মোট ৬০টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে সরকারি অনুদান পেয়েছে ৪১টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বিবর্তন যশোর। সংগঠনভেদে সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার এবং সর্বনিম্ন ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও সরকারি প্রজ্ঞাপনে ঘোষিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালনে অধিকাংশ সংগঠনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ব্যতিক্রম হিসেবে প্রাচ্যসংঘ, জিয়া সংস্কৃতি পরিষদ, জাসাস ও জিয়া পাঠাগারসহ হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
২০২৫ সালের ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে সেই ঘোষণার পর অনুষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্রীয় পালনে যশোরের প্রথম সারির অধিকাংশ সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট থেকে ‘সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে যশোরের অধিকাংশ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়কারী প্ল্যাটফর্ম ছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সংগঠন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে জোটটি অনেকটা প্রকাশ্যেই তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল; যা প্রকারান্তরে গণবিরোধী অবস্থানেরই প্রকাশ। একথা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, শেখ হাসিনা তো একা একা দানব হয়ে ওঠেননি, তার পক্ষে বয়ান তৈরির কাজ করেছেন এদেশের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে নেতৃত্বদানকারীরা।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট জোটের ব্যানারে যশোর শহরে একটি মিছিল বের হয়। সে সময় জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন দীপঙ্কর দাস রতন এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন সানোয়ার আলম খান দুলু। জোটে মোট ৩৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্পৃক্ত ছিল।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জোটটির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে একই প্ল্যাটফর্মের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ’।
অন্যদিকে, জেলা জামায়াতের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে বর্তমানে প্রায় ৩৬টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত সক্রিয় রয়েছে ১০ থেকে ১৫টি।
জুলাই শহীদ দিবস নিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন
সরকারঘোষিত ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার কারণ জানতে যশোরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। অধিকাংশের দাবি, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কোনো আমন্ত্রণপত্র বা আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে একজন নেতা দিবসটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
যশোর ইনস্টিটিউটের সহ-সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বিবর্তন যশোরের সাবেক সভাপতি সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘আমি ১৬ জুলাই এই শহীদ দিবস মানি না। এটা একটা ষড়যন্ত্র। শহীদ দিবস আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি মানি। সরকার নতুন করে যে শহীদ দিবস ঘোষণা করেছে, সে বিষয়ে কিছু জানি না। গত ১৬ জুলাই কোনো দিবস পালন হয়েছে- এটাও জানতাম না। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কোনো চিঠি বা মৌখিকভাবে জানানো হয়নি।’
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যশোর জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, ‘সরকারিভাবে ১৬ জুলাই যে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়েছে, সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। আগে থেকে কোনো চিঠি দেওয়া হলে কিংবা প্রস্তুতি সভায় ডাকা হলে অবশ্যই অংশগ্রহণের সুযোগ থাকতো। যেহেতু আমাদের জানানো হয়নি, তাই আমরা যুক্ত হতে পারিনি।’
থিয়েটার ক্যাম্পাসের পরিচালক কামরুল হাসান রিপন বলেন, ‘সরকারি কোনো অনুষ্ঠান হলে সাধারণত আমাদের জানানো হয়। কিন্তু ১৬ জুলাই শহীদ দিবস-সংক্রান্ত কোনো কর্মসূচির বিষয়ে প্রশাসন থেকে কোনো বার্তা পাইনি। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে সাংস্কৃতিক সংগঠনের যে দায়িত্ব থাকে, আমরা তা পালনে বাধ্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের অবহিতই করা হয়নি।’
এই বিষয়ে জেলা প্রশাসনের ভাষ্য, সময় স্বল্পতার কারণে সবার কাছে পৃথকভাবে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
জুলাইযোদ্ধারা যা বলছেন
তবে জুলাইযোদ্ধাদের দাবি, বিগত সরকারের সময় প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ধরে রাখতেই কিছু সংগঠন এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে পারছে না। একইসাথে সরকারি সুবিধা ভোগ করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
জুলাইযোদ্ধা মারুফ হাসান সুকর্ণ বলেন, “বেশ কয়েকদিন আগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে যশোরের প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে অর্থ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সংস্কৃতি অঙ্গনের একটা ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাথে। সেটা আমরা এই ১৬ জুলাই দেখতে পেরেছি। কোনো একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে ফুল কিংবা শ্রদ্ধা জানাতে অংশ নেয়নি, কিন্তু সরকারি সুবিধা নিতে তাদের কোনো কমতি নেই। রাষ্ট্রীয় একটি প্রোগ্রাম, এখানে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে- সেই প্রোগ্রামে তারা অংশ নিলো না। অথচ, টাকার ভাগ নিতে সবাই এসেছিল। যশোর শিল্প-সংস্কৃতির জেলা, সারাদেশ জানে। এমন একটি জায়গায় ধান্ধাবাজ দিয়ে ভর্তি হয়ে গেছে, এটা আশা করিনি। বিগত সময়েও যারা সুবিধা পেয়েছিল, এখনো পাচ্ছে।’’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, ‘১৬ জুলাই শহীদ দিবসে আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম সকল নাগরিক বিশেষ করে সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ, প্রত্যেক সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের একটা বড় অংশ বিগত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। যার কারণে তারা কিছুটা বঞ্চিত মনে করে নিজেদের।’
রাশেদ বলেন, ‘এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই নাচ, গান ও শিল্পচর্চার ওপরে একধরনের বাধা আমরা লক্ষ্য করেছি। সেটাও আবার করেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ব্যানারে। সেজন্য তাদের এক ধরনের ক্ষোভ থাকতে পারে। সব মিলিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের জুলাইয়ের প্রতি যে অনাগ্রহ এটা দুঃখজনক। কারণ জুলাইয়ে হাজারখানেক মানুষ জীবন দিয়েছেন। এটা যেমন সত্যি, প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী শ্রমিক শ্রেণির মানুষ আহত হয়েছেন, তাদের অঙ্গহানি হয়েছে এটাও সত্যি। এতো বড় একটা গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি না দেওয়াকে আমি মানসিক দৈন্য মনে করি।’
সংগঠক ও অ্যাক্টিভিস্ট বেনজীন খান বলেন, ‘যশোরের বেশিরভাগই সংগঠন ১৬ জুলাই শহীদ দিবস মানে না। এটা তারা অনেক আগে থেকেই পরিস্কার করেছে। তারা একটা চিন্তা ধারণ করে। সে কারণে তারা এর প্রতিপক্ষ। এই রাষ্ট্র জুলাই বিপ্লবের ফসল। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং আরো সুবিধা দিয়েছে। রাষ্ট্র যদি এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমার দৃষ্টিতে রাষ্ট্র স্বয়ং পূর্বের অবস্থানেই রয়েছে। আমাদের এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে।’
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
চিঠি না পৌঁছানোর বিষয়টি আংশিক স্বীকার করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৬ জুলাই শহীদ দিবস পালনের প্রজ্ঞাপন একদম শেষসময়ে হাতে পাওয়া ও অনুষ্ঠান স্বল্প পরিসরে হওয়ায় অনেক সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়। আমরা শুধু তথ্য পাঠিয়েছি। গত ১৬ জুলাই শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানটি সীমিত থাকার কারণে সকলকে চিঠি দেওয়া হয়নি। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাদে বেসরকারি সংগঠনগুলো নিজ উদ্যোগে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। আশা করি, ৫ আগস্টের আয়োজন বড় পরিসরে হবে। সেখানে সব সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশগ্রহণ করবে।’