যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে জীবিকার তাগিদে রিকশা চালান পঙ্গু বাবা

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩১ জুলাই,২০২৬, ১১:০০ এ এম
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে জীবিকার তাগিদে রিকশা চালান পঙ্গু বাবা

এক পা পঙ্গু। এমন শারীরিক অবস্থা নিয়েই প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে রিকশা চালান যশোরের আলমগীর হোসেন। ২০১৯ সালের সড়ক দুর্ঘটনায় কর্মক্ষমতা হারানোর পর একমাত্র ছেলে আল-আমিন বিশ্বাসই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। ছেলে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে, সংসারের দায়িত্ব নেবে, এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন বাবা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যশোরের জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে ছেলেকে হারিয়ে সেই স্বপ্নও শেষ হয়ে গেছে। এখন ছেলের স্মৃতি আর বুকভরা কষ্ট নিয়েই জীবনের চাকা টেনে চলছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ গেজেটের ২৬৬ নম্বরে রয়েছে মো. আল-আমিন বিশ্বাসের নাম। সরকারি গেজেটে বাবা হিসেবে মো. আলমগীর হোসেন এবং ঠিকানা হিসেবে যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের সুজলপুর হঠাৎপাড়া উল্লেখ রয়েছে।

আল-আমিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। বাবা আলমগীর হোসেন একসময় নছিমন চালিয়ে সংসার চালাতেন। ২০১৯ সালের ১১ মে সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পা বিকল হয়ে যাওয়ার পর সংসারে নেমে আসে চরম সংকট। সংসারের হাল ধরতে আল-আমিন একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ নেন। প্রায় এক বছর পর বাবা আবার রিকশা চালানো শুরু করলে আল-আমিনকে আব্দুর রাজ্জাক কলেজে ভর্তি করান। সেখান থেকে এইচএসসি শেষ করে একই প্রতিষ্ঠানে অনার্সে ভর্তি হন।

ছেলের কষ্ট দেখে এক পা পঙ্গু অবস্থাতেই রিকশা চালানো শুরু করেন বাবা আলমগীর হোসেন। বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিদিন রিকশা চালিয়েই চলছে সংসার। আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমি তখন রিকশা চালাচ্ছিলাম। বাসা থেকে ফোন এলো, আল-আমিনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে বাড়ি এসে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজলাম। শেষে জাবির হোটেলের সামনে গিয়ে জানতে পারি মরদেহ সদর হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকেই ছেলের লাশ উদ্ধার করি।’

‘আমার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। কলেজ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে যেতো। ওর স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করা।’

‘একমাত্র ছেলে বেঁচে থাকলে হয়তো এই বয়সে আর আমাকে রিকশা চালাতে হতো না। ও পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চাইতো। আমার স্বপ্ন ছিল, ছেলে সংসারের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, আমার ছেলের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং অসহায় এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হোক,’ বলেন আলমগীর হোসেন।

মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে মিছিলের লাইভ দেখে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আমি বুঝতেই পারিনি। পরে বন্ধুরা এসে কয়েকবার খোঁজ করে। এরপর খবর পাই, আমার ছেলে মিছিলের মধ্যে বিপদে পড়েছে। যশোর শহরের যেখানে যেখানে মিছিল গেছে, সব জায়গায় খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। শেষে রাত ১০টার পরে হাসপাতালের মর্গে গিয়ে আমার সন্তানের মরদেহ পাই।’

‘আমার ছেলের খুব ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে। দুইবার চেষ্টা করেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, তাবলিগে যেতো, পড়াশোনার প্রতি খুব মনোযোগী ছিল। আন্দোলনের আগে আমি ওর জন্য একটি দোকানে চাকরিও ঠিক করেছিলাম। মাসে আট হাজার টাকা বেতন। কিন্তু সেখানে যোগ দেওয়ার আগেই আমার ছেলে চলে গেল,’ বলেন একমাত্র সন্তানহারা মমতাজ বেগম।

সুবর্ণভূমির এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক লোকজন এসে ২০ হাজার টাকা, চাল-ডাল ও বাজারসামগ্রী দিয়েছিল। পরে ঢাকা থেকে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়।’

সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমার একটাই সন্তান ছিল। স্বামীও অসুস্থ। আমি চাই, আমার ছেলে শহীদের মর্যাদা পাক এবং সরকার আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াক।’

দাদি রোকেয়া বেগম বলেন, “বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আল-আমিন হেসে বলেছিল, ‘আমি বাংলাদেশ স্বাধীন করে আসছি।’ এরপর আর ফিরে আসেনি। রাতে হাসপাতাল থেকে লাশ বাড়িতে আনা হয়। ও কোথাও ঘুরে বেড়াতো না। স্কুল-কলেজ আর মসজিদ নিয়েই থাকতো।”

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আল-আমিন ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও ধর্মপরায়ণ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন, তাবলিগ জামাতে যেতেন এবং পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

জাবির হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয়ভাবে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। আশপাশের কিছু মানুষ দাবি করেন, আল-আমিন চুরি বা লুটপাট করতে গিয়ে মারা গেছেন। কিন্তু পরিবার ও প্রতিবেশীরা এই অভিযোগ মানেন না।

জাবির হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের তালিকা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পুনঃযাচাই কার্যক্রম চলছে। পরিবারের প্রত্যাশা, সব যাচাই শেষে আল-আমিনের শহীদের মর্যাদা বহাল থাকবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)