যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মৃত্যুর সময় অর্ধপোড়া জাতীয় পতাকা ছিলো ইউসুফের মাথায়

কাজী আশরাফুল আজাদ

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ১ আগস্ট,২০২৬, ১০:০০ এ এম
মৃত্যুর সময় অর্ধপোড়া জাতীয় পতাকা ছিলো ইউসুফের মাথায়

গেজেট হলেও এখনো প্রকাশ করা হয়নি জুলাই আন্দোলনে যশোরে নিহত ইউসুফ আলীর নাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চালকলাদারের মালিকানাধীন হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুনে পুড়ে মারা যায় সেই সময়কার ১৫ বছরের কিশোর ইউসুফ আলী। বড় ভাই ইয়াসিনের সাথে ইউসুফও গিয়েছিলো হোটেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে। ইয়াসিন আট থেকে দশজনকে উদ্ধার করতে পারলেও ছোট ভাই ইউসুফকে উদ্ধার করতে পারেননি। সেখানেই নিখোঁজ হয় ইউসুফ। পরে তার লাশ মেলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। ইয়াসিনও দ্বগ্ধ হন আগুনে।

এসব তথ্য দেন নিহত ইউসুফের মা শাহিনা আক্তার।

বাড়িটিতে গিয়ে জানা যায়, চার ছেলে আর এক মেয়ে মানিক হোসেন ও শাহিনা আক্তার দম্পতির। মানিক হোসেন ট্রাকের চালান। বড় ছেলে জীবন, মেজো ছেলে ইয়াসিন, সেজো ছেলে ইউনুসের আলাদা সংসার। ছোট ছেলে ইউসুফ আর একমাত্র মেয়ে মাহিয়া আক্তারকে নিয়ে এই দম্পতি বসবাস করেন যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিলের পশ্চিমাংশের জাহেদার বাড়িতে। সাত বছর ধরে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকেন। মেয়ে মাহিয়া চাঁচড়া মধ্যপাড়া জামিয়া মাদরাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। থাকে ওই মাদরাসার আবাসিকে। শুধুমাত্র ইউসুফ থাকতো মা-বাবার কাছে।

জুলাইয়ের আন্দোলনের দিনগুলোর বিষয়ে ও ইউসুফ সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহিনা আক্তার বলেন, ইউসুফ খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলো। লেখাপড়ার প্রতি তার মনোযোগ ছিলো কম। রেলস্টেশন মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। এরপর তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় চাঁচড়া রায়পাড়া কলোনি স্কুলে। সেখানে পঞ্চম শ্রণি পর্যন্ত পড়েছে। ফুটবল আর ক্রিকেট খেলার প্রতি মনোযোগী হওয়ায় সারাক্ষণ খেলার মাঠে থাকতো। লেখাপড়াটা আর এগোয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় প্রতিদিন বন্ধুদের সাথে মিছিলে যেতো ইউসুফ। চাঁচড়া চেকপোস্টে যখন জুলাইয়ের আন্দোলনকারীরা একজোট হতো; সেখানে নিয়মিত তার হাজিরা থাকতো।

খেলায় পাওয়া ইউসুফের পদক ও ট্রফি দেখিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে শাহিন আক্তার বলছিলেন, প্রতিদিন মিছিলে যাওয়া ছিলো ইউসুফের কাজ। নিষেধ না মেনে চুরি করে চলে যেতো। ৫ আগস্ট (২০২৪) সকালে ঘুম থেকে উঠে খাটের ওপর বসে ইউসুফ। রুটি বানিয়ে খেতে দেওয়া হয় তাকে। তার বাবা মানিক হোসেন আগেই চলে যান বেনাপোলে। রুটি খেয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউসুফ বাড়ি থেকে বের হয়। সেই যে গেলো আর ফিরলো রাতে লাশ হয়ে।

এই নারীর বর্ণনা মতে, ‘মেজো ছেলে ইয়াসিন দুপুরের দিকে ফোন দিয়ে খোঁজ-খবর নেয়। বিকেলে হোটেল জাবিরে আগুনের সংবাদ শুনে ইয়াসিন সেখানে যায়। জাবিরের সামনে দেখা হয় ইউসুফের সাথে। দুই ভাই হোটেল আটকেপড়াদের উদ্ধার করতে থাকে শত শত মানুষের সাথে। ইয়াসিন আগুনে পুড়ে আহত ৮/১০ জনকে উদ্ধার করে। আগুনে ইয়াসিনের দুই হাত পুড়ে যায়। পরে সে হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ইউসুফের খোঁজ করতে থাকে। কিন্তু ইউসুফ কোন ফাঁকে জাবিরের হোটেলের ওপরে উঠে যায় তা খেয়াল করতে পারেনি। অনেক খোঁজা হয় সেখানে। কিন্তু পাওয়া যায়নি। পরে রাত ৯টার দিকে হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ইউসুফের মরদেহ দেখতে পায় তার বড় ভাই ইয়াসিন। মৃত্যুর সময়ও অর্ধপোড়া জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিলো ইউসুফের মাথা। রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নেওয়া হয় বাসায়। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় বাড়িতে।’

তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খোঁজ খবর বা সহযোগিতা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে শাহিনা আক্তার বলেন, ‘জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এককালীন কিছু টাকা, যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় আর শিশু মন্ত্রণালয় থেকে কিছু টাকা দেওয়া হয়। সাথে শ্রদ্ধাকার্ড ও কিছু উপহার সামগ্রী পাঠানো হয়েছে। মাসিক ভাতা চালু হয়েছে শুনেছি, কিন্তু আমাদের দেওয়া হয়নি। গেজেটে কী একটা সমস্যা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনে আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি। ঘরটা শূন্য হয়ে গেছে। ইউসুফই থাকতো আমার কাছে। এখন বাড়িতে আমি একাই থাকি বেশির ভাগ সময়।’

ইউসুফের খেলায় পাওয়া বিভিন্ন পদক দেখিয়ে বলেন, ‘এই মেডেল আর নানা ট্রফির দিকে তাকালে ইউসুফের কথা মনে পড়ে। বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠে। সন্তান হারানোর বেদনা কত যন্ত্রনার এটা কাউকে বোঝাতে পারবো না।’

তিনি বলেছেন, যশোরের জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে নানা কথা হয়। বিশেষ করে হোটেল জাবিরে যারা মারা গেছে তাদেরকে নিয়ে। বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত করে দেখা উচিৎ প্রশাসনের।

জানতে চাইলে প্রতিবেশী শাহিদুর রহমান বলেন, ‘ইউসুফ প্রতিদিন মিছিলে যেতো। মাঝে মধ্যে মাহির সাথে বাড়িতে ফিরতে দেখতাম। যেদিন আগুনে পুড়ে মারা যায়, সেদিন রাতে একসাথেকে তিনটি লাশ ঢোকে এলাকায়।’

তিনিও চান মাহি, ইউসুফ, আলিফদের শহীদের মর্যাদা দেওয়া হোক।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)