যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ইতিহাস

বাঁশের কাছে তাজমহলের ঋণ

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : রবিবার, ২ আগস্ট,২০২৬, ১২:০০ পিএম
বাঁশের কাছে তাজমহলের ঋণ

কবিগুরু তাজমহল নিয়ে অনেক মন্তব্য করেছেন। তবে বলাকা গ্রন্থের উত্তিটির আবেদন চিরন্তন, ‘হীরা মুক্তামানিক্যের ঘটা যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা, যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক, শুধু থাক্ একবিন্দু নয়নের জল, কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল, এ তাজমহল।’

তাজমহলকে ভারতের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যের মধ্যে একটি তো বটেই, পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যেও গণ্য করা হয়। তাজমহল নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। শেষ নেই গল্পেরও। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার নাকি ভারী চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল তাজমহলকে নিয়ে। মর্ত্যরে এই অসাধারণ স্থাপনাকে জাপানের বিমান হামলা থেকে বাঁচানো যাবে কি না, সেটা নিয়েই তৈরি হয়েছিল শঙ্কা। তবে সে-যাত্রায় তাজমহলকে বাঁচিয়েছিল বাঁশ।

এই বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির অন্যতম পক্ষ ব্রিটেন তখন ভারতবর্ষের শাসক। তাই ভারতকেও যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হয়। জাপানি বোমা পড়ার ভয়ে একসময় রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল ভারতবর্ষের মানুষ। জাপানি বোমারু বিমান যাতে তাজমহলকে চিহ্নিত করতেই না পারে, সেজন্য অভিনব আর মজার এক উপায় অবলম্বন করেছিল সেকালের ব্রিটিশ শাসক। সে সময় আকাশযুদ্ধের দিশা দেখানোয় একমাত্র ভরসা ছিল কম্পাস। তাই ব্রিটিশরা তাজমহলকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছিল বাঁশের খাঁচায়। যাতে উপর থেকে দেখলে তাজমহলের আকৃতি কোনোভাবেই বোঝা না যায়, মনে হয় অনেক বাঁশ স্তূপাকারে রাখা আছে। অর্থাৎ তাজমহলকে একরকম ছদ্মবেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে তাজমহলকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা জাপানিদের ছিল কি না, সেটা কেউ জানা যায় না। আর গোটা বিশ্বযুদ্ধে সত্যিই কোনো বোমা পড়েনি তাজমহল চত্বরে। হয়তো বাঁশের দৌলতেই বেঁচে গিয়েছিল ভারতের গর্ব। একই কায়দায় দিল্লির লালকেল্লাও নাকি রক্ষা পেয়েছিল।

তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশে আগ্রায় অবস্থিত একটি রাজকীয় সমাধি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগমের (যিনি মুমতাজ মহল নামে পরিচিত) স্মৃতির উদ্দেশে এই অপূর্ব সৌধটি নির্মাণ করেন। মুমতাজ মহল তাদের চতুর্দশ কন্যা সন্তান গৌহর বেগমকে জš§ দিতে গিয়ে মারা যান। সৌধটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে, শেষ হয়েছিল ১৬৫৩ সাল নাগাদ।

তাজমহলের নির্মাণশৈলীতে পারস্য, তুরস্ক, ভারতীয় এবং ইসলামি স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। যদিও সাদা মার্বেলের গম্বুজাকৃতির রাজকীয় সমাধিটিই বেশি সমাদৃত, তাজমহল আসলে সামগ্রিকভাবে একটি জটিল অখণ্ড স্থাপত্য। এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে আগ্রা ভ্রমণ করে ফরাসি পর্যটক ফ্রান্সিস বেরনিয়ার লিখেছিলেন, ‘‘দুটো বিস্ময়কর সমাধির বিবরণ দিয়ে আমি চিঠিটি শেষ করবো, যারা আগ্রাকে দিল্লির চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছে। একটি নির্মাণ করেছেন সম্রাট জাহাঙ্গীর তার পিতা আকবরের সম্মানে এবং অন্যটি সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীর স্মরণে তৈরি করেছেন ‘তাজমহল’, যা অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী। স্বামী তার স্ত্রীর শোকে এতই শোকার্ত যে, স্ত্রী জীবনে যেমন তার সাথেই ছিলেন, মরণেও তিনি তার কবরের কাছেই থাকবেন।’’

উল্লেখ্য, ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হুমায়ূনের মাজার দেখতে প্রায় তাজমহলের মতো।

তাজমহল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নকশার উপর, বিশেষ করে পারস্য ও মুঘল স্থাপত্য অনুসারে। নির্দিষ্ট কিছু নকশা তিমুর ও মুঘল ইমারতের মতো হুবহু করা হয়েছে। যাদের মধ্যে তিমুরের গুর-ই-আমির, সমরখন্দে মুঘল সাম্রাজ্যের পূর্বসূরি, হুমায়ূনের মাজার, ইমাদ-উদ-দৌলার মাজার এবং দিল্লিতে শাহজাহানের তৈরি দিল্লি জামে মসজিদ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তরফে তাজমহলকে বাঁশের খাঁচা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। উপর থেকে একে দেখতে লাগছিল বাঁশের মজুদের মতো। একই রকমভাবে তাজকে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ও।

তাজমহল দিনভর তার রং পরিবর্তন করতে থাকে। কারণ তাজমহল যেহেতু সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি, তাই সূর্যের রশ্মি এর গায়ে পড়লে তার রং হলুদ হয়ে যায় এবং দিনের শেষে ধীরে ধীরে নীল হয়ে যায়। অনেকে এটিকে নিয়ে কাব্য করে থাকেন। তাদের বিশ্বাস, এই রং পরিবর্তনটি মুমতাজের মৃত্যুর আগে এবং পরে শাহজাহানের মানসিক পরিবর্তনকে বোঝায়।

তাজমহলের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক উপমাই দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে যতই বর্ণনা শুনুন না কেন, তাজমহল প্রকৃতপক্ষে কতটা সুন্দর তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। বিশ্বের এই সপ্তমাশ্চর্যকে একবার চোখের দেখা দেখতে হাজার হাজার বিদেশি ভারতে আসেন। দিনের বেলা হোক বা পূর্ণিমার রাত, একেক সময় তাজের সৌন্দর্য একেক রকম। সেকাল থেকে শুরু করে একালেও তাজমহলের সামনে গিয়ে ছবি তোলার লোভ পর্যটকরা সামলাতে পারেন না।

জনশ্রুতি রয়েছে, নটবরলাল নামে (প্রকৃত নাম মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব) এক ভারতীয় তাজমহল ও লালকেল্লাকে নাকি বেচে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে তাজমহলকে বেচেছিলেন তিনবার। একজন সরকারি কর্মকর্তা সেজে তিনি বিদেশি পর্যটকদের বোকা বানিয়ে তাজমহল বেচে দিয়েছিলেন। বেচে দিয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনও। তাকে তার অপরাধের জন্য ১১৩ বছরের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সব মিলিয়ে ২০ বছর জেলে কাটান।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)