উদ্ভিদবিদ্যা
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
ক্যাশাপোনা গাছের ‘হাঁটার’ ব্যাপারে অনেক বিজ্ঞানীর সায় থাকায় অনেকে মনে করেন, আসলেই গাছটি হাঁটতে পারে। বলা হয়ে থাকে, ক্যাশাপোনা গাছ জে আর আর টলকিনের মহাকাব্য ‘লর্ড অব দ্য রিংস স্যাগা’য় বর্ণিত গাছের মতো সারা বন হেঁটে বেড়ায়! বিশেষত একদল টুরিস্ট ভিডিওর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একটি চিহ্নিত ক্যাশাপোনা গাছ তার মূল অবস্থান থেকে ২০ মিটার পশ্চিমে সরে গেছে।
প্রকৃতপক্ষে আমরা হাঁটা বলতে যা বুঝি, গাছের পক্ষে সেভাবে কখনই তা সম্ভব নয়। তবে এই গাছটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গাছটি যদি বুঝতে পারে, তার কোনোদিকে মাটি সরে যেতে পারে, তাহলে এটি নিরাপদ দিকে দ্রুত নতুন শেকড় গজানোর মাধ্যমে কাণ্ডসহ মূল অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে পারে। শেকড়ের সাহায্যে অবস্থান পাল্টানোর এই ক্ষমতাকেই ‘হাঁটা’ বলা হচ্ছে, অন্য কিছু নয়।
অথচ একদল বিজ্ঞানী এখনো এটা বলেন, ইচ্ছে করলেই ক্যাশাপোনা গাছ পুরো জঙ্গল চষে বেড়াতে পারে। এই ধারণাটি একটা মিথ ছাড়া আর কিছু নয়। হালের গবেষকরা এটাও লক্ষ্য করেছেন, কোনো কারণে সূর্যের আলো সরাসরি পেতে অসুবিধা হলে ক্যাশাপোনা গাছ এমন অবস্থানে ধীরে ধীরে চলে যেতে পারে, যেখান থেকে থেকে গাছটি সূর্যালোক শোষণ করতে পারে। সোজা কথায় গাছটির কাণ্ড স্থির থাকলেও এর শেকড় অবস্থান পাল্টায়। এটাকেই ধরে নেওয়া হয়েছে ক্যাশাপোনা গাছের হাঁটা হিসেবে। বিজ্ঞানীরা একটা হিসাবও দিয়েছেন গাছটির হাঁটার গতিবেগের। সেটি হচ্ছে, গাছটি দৈনিক দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার হারে অবস্থান পাল্টায়। এই হিসেবে গাছটি বছরে ২০ মিটারের মতো হাঁটে।
কোস্টারিকা ইউনিভার্সিটির খ্যাতিমান উদ্ভিদবিজ্ঞানী গেরারডো আভালস দীর্ঘদিন ক্যাশাপোনা গাছের পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এভাবে: ‘চলমান গাছে যে প্রপঞ্চ আমাদের মাঝে চালু রয়েছে, সেটা একটা মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়। তার ভাষায়, এই গাছের শেকড় গতিশীল। কিন্তু এর অর্থ নয় যে, গাছটির শেকড় মোটর গাড়ির মতো গতিশীল। বরং গাছটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা নতুন অবস্থানের দিকে যেতে চায়। বিশেষত এমন জায়গা সব সময় বেছে নিতে চায়, যেখানে মাটির ধস কম। শেকড় সরলেও এটা কাণ্ড কিন্তু আগের অবস্থানে রয়ে যায়।
পাম গোত্রের এই গাছ ‘চলমান পাম’ নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম Socratea exorrhiza। এ গাছের শিকড় মাটির ওপরে অনেকটা পায়ের মতোই খাড়া দৃশ্যমান। এগুলোকেই গাছটির লম্বা পা ধরে নেওয়া হয়েছে। ক্যাশাপোনা গাছের তাক লাগানো আচরণ ১৯৮০ সালে প্রথমবার চিহ্নিত করেন গবেষক জন এইচ বডলি। এই গাছের উচ্চতা হয় প্রায় ১৬-২০ মিটার এবং ব্যাস ১২-১৬ সেমি। স্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভিদবিজ্ঞানী পিটার ভ্যানস্কি প্রথম মত দেন, ‘টিকে থাকার তাগিদেই শিকড়ের সাহায্যে জায়গা পরিবর্তন করতে পারে গাছটি। কখনো কখনো দিনে দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার পর্যন্ত। আসলে ওই অঞ্চলে ভূমিক্ষয়ের হার খুব বেশি। আর জঙ্গল গভীর হওয়ার সর্বত্র সূর্যের আলোও পৌঁছাতে পারে না। তাই গোড়ার মাটি যখন আলগা হয়ে আসে, তখন এই পাম গাছগুলো অপেক্ষাকৃত শক্ত মাটি এবং বেশি আলোর সন্ধানে উঁচু উঁচু নতুন ঠেসমূল জাতীয় শিকড় তৈরি করে। এক দিকে যখন সেই নতুন শিকড় শক্ত মাটিতে ক্রমশ গেঁথে যেতে থাকে, পুরনো শিকড়গুলো ধীরে ধীরে মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এভাবেই গাছটি একটু একটু করে আগের জায়গা থেকে সরে যায়।’ ভ্যানস্কির কথায়, ‘‘এভাবে পুরোপুরি জায়গা বদল করতে একটি গাছের প্রায় দু’বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’’
শুধু তাই নয়, পড়শি কোনো গাছ গায়ে ঢলে পড়াও একেব্বারে না-পছন্দ ক্যাশাপোনার। সেক্ষেত্রে ঝুট-ঝামেলায় না গিয়ে চুপচাপ গুটিগুটি পায়ে স্থান বদল করে পাম গোত্রের এই গাছ। ইকুয়েডরের রাজধানী কুইটো থেকে গাড়িতে ঘণ্টা তিনেকের পথ। তারপরই শুরু জঙ্গলের রাস্তা। বেশ কয়েক ঘণ্টার দুর্গম পথ পেরিয়ে গেলেই মিলবে সুমাকো বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ফরেস্ট। সেখানেই রয়েছে আজব এই গাছ। এই অরণ্য ছাড়া এদের দেখতে পাওয়া যায় না বিশ্বের আর কোনো প্রান্তেই। আর সেই কারণেই একুশ শতকেরও শুরুতে ইকুয়েডরের এই সংরক্ষিত অরণ্যকে ‘হার্ট অব দ্য ইউনেস্কো’ নামে ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই পাম জাতীয় উদ্ভিদগুলো অ্যামাজনের আদিবাসীরা লাকড়ি ও ঘর নির্মাণে ব্যবহার করে। এই গাছে হলুদ এক ধরনের ফলও হয়ে থাকে। তাছাড়া শিকড়গুলো এফ্রিডিসিয়াক এবং হেপাটাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
১৯৮০ সালে জীববিজ্ঞানী জন এইচ বোডলি ক্যাশাপোনা গাছের এই হেঁটে চলার ব্যাপারটা প্রথম ব্যাখ্যা করেন। এই উদ্ভিদের বাহ্যিক গঠনের মিল দেখা যায় ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদ সুন্দরী গাছের সঙ্গে। সুন্দরী ম্যানগ্রোভ হওয়ায় এতে যেমন শ্বাসমূল বা ঠেসমূলের উপস্থিতি দেখা যায়, ওয়াকিং পামের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম।
ইকুয়েডরের এই অঞ্চলে শুধু ওয়াকিং পাম নয়, আরও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী পাওয়া যায়। যা পৃথিবীর অন্য কোনো জায়গায় পাওয়া যায় না। জায়গাটির নাম ‘সুমাকো বায়োস্ফিয়ার’। দুর্গম এই জায়গায় ভ্রমণ করতে প্রায় একদিন সময় লাগে।