যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ব্রয়লার মুরগির শরীরে বাসা বাঁধছে ‘সুপারবাগ’

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর,২০২৫, ০৯:৩৫ পিএম
ব্রয়লার মুরগির শরীরে বাসা বাঁধছে ‘সুপারবাগ’
Subornovumi

ব্রয়লার (পোলট্রি) মুরগির শরীরে বাসা বাঁধছে মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া বা ‘সুপারবাগ’। এটা মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে এমনটি হচ্ছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি পোলট্রি খামারের বর্জ্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল গবেষকের গবেষণায় সম্প্রতি এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি ‘এশিয়ান-অস্ট্রালাশিয়ান জার্নাল অব ফুড সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি’তে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশের মোট ব্রয়লার উৎপাদনের ৭০-৮০ শতাংশই আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের কাছ থেকে। তাদের অধিকাংশই ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না। বরং ফিড ডিলার বা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কথায় রোগ হওয়ার আগেই ‘সুরক্ষা’ বা ‘ইনস্যুরেন্স’ হিসেবে মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াচ্ছেন।

সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এনরোফ্লক্সাসিন ও টেট্রাসাইক্লিনের মতো ওষুধের ব্যাপক অপব্যবহারের কারণে মুরগির মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। খুচরা বাজার থেকে সংগৃহীত ব্রয়লার মাংসের নমুনা বিশ্লেষণে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। নমুনার ২২ শতাংশে ফ্লোরোকুইনোলোন এবং ১৮ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিনের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। দেশের পোলট্রি খামারগুলো থেকে সংগৃহীত ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার নমুনার মধ্যে ৭৫ শতাংশেরও বেশি ‘মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট’ (একাধিক ওষুধ প্রতিরোধে সক্ষম)। আতঙ্কের বিষয় হলো মুরগির অন্ত্রে ‘এমসিআর-১’ (mcr-1) জিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা কোলিস্টিন নামক অ্যান্টিবায়োটিককে অকার্যকর করে দেয়। কোলিস্টিন মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যান্টিবায়োটিক। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এভাবে অল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশ অ্যালার্জি, অঙ্গপ্রতঙ্গের সরাসরি বিষক্রিয়া এবং মানব অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও পোলট্রি বর্জের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গবেষণার তথ্যমতে, একটি ব্রয়লার মুরগি তার জীবনচক্রে প্রায় ১.৫ থেকে ২ কেজি বর্জ্য (লিটার) ত্যাগ করে। দেশে বছরে ২০০ মিলিয়নের বেশি মুরগি উৎপাদিত হয়, যার বিপুল বর্জ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরিশোধিত অবস্থায় জমিতে বা জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানি ও নদীনালায় নাইট্রেট ও ফসফরাস মিশে পানি দূষিত করছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণ ঘটাচ্ছে।

গবেষকদলের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রয়লারশিল্প আমাদের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে ঠিক; কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক সংকট এই অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য নীতির কোনো বিকল্প নেই। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্যটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আমাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসাবে প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক প্রভৃতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

এছাড়া বায়োসিকিউরিটি জোরদার, টিকাদান কর্মসূচি নিশ্চিত, নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খামারিদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারের অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ বিক্রি বন্ধ করতে কঠোর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, গবেষকদের টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং নিরাপদ ও টেকসইভাবে উৎপাদিত মুরগির মাংসের চাহিদা নিশ্চিত করতে হবে। সময় থাকতে আমরা যদি সচেতন হই এবং ‘ওয়ান হেলথ’ নীতির সমন্বিতভাবে কাজ করি, তাহলে এই শিল্পকে একটি নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারব। আমাদের আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কতটা নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করতে পারি।

 

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)