সুবর্ণভূমি ডেস্ক
বিজেপি নতুন সরকার গঠন করবে। কিন্তু কবে সেই সরকারের শপথ, তা মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। যদিও ফলাফল ঘোষণার দিন সন্ধ্যায় দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তা থেকে ধারণা করা হচ্ছে ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীতেই পশ্চিমবাংলার মসনদে বসতে যাচ্ছে বিজেপি সরকার।
এটা আজ বুধবার (৬ মে) রাতেও স্পষ্ট হতে পারে। আজ কোলকাতায় আসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। তিনি বিজেপি সংসদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করে নেতার নাম ঘোষণা করতে পারেন। এটি ঘোষিত হলেই জানা সম্ভব হবে কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী, আর বিজেপি সরকার কবে শপথ নিতে পারে।
তবে, সবকিছু ছাপিয়ে এখন একটাই প্রশ্ন মমতা বন্দোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ না করলে কী হবে? ভারতীয় সংবিধান বা আইনই-বা এক্ষেত্রে কী বলছে।
কৌতুহল বাড়িয়ে দিয়েছেন মমতা
সোমবার (৪ মে) দুপুরেই ভোটের ফল মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখনই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখন লোকভবনে যাবেন? কখন মুখ্যমন্ত্রীত্বে ইস্তফা দেবেন? কারণ, সেটাই রীতি।
মমতার আগের ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রীরা তেমনই করে এসেছেন। বস্তুত, মমতা যখন সোমবার রাতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল থেকে বেরোলেন, অনেকেই তখন ভেবেছিলেন, এর পরে তিনি লোকভবনে গিয়ে রাজ্যপালের হাতে ইস্তফাপত্র তুলে দেবেন। কিন্তু মমতার কনভয় চলে যায় কালীঘাটে তার বাড়ির পথে।
কৌতূহল তখনও ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার (৫ মে) বিকালে মমতা সরাসরি জানিয়ে দিলেন, তিনি ইস্তফা দেবেন না! কারণ, তিনি হারেননি। তাই লোকভবনে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। মমতা বলেছেন, ‘কেন পদত্যাগ করবো? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?’
মমতা বন্দোপাধ্যায় যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা না-দেন, তা হলে কী হবে?
কী বলছে ভারতীয় সংবিধান
ভারতীয় সংবিধানে এমন পরিস্থিতির কথা নির্দিষ্ট উল্লেখ করে কিছু বলা নেই। কারণ, কোনও মুখ্যমন্ত্রী ভোটে পরাস্ত হয়েও যে রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেবেন না, এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে কেউ মনে করেননি।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞেরা বেশ কিছু ধারণার কথা বলছেন। যা অতীতে কোনও না কোনও রাজ্যে ঘটেছে। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না-দেওয়ার নজির দেশে নেই। ফলে মমতা শেষ পর্যন্ত ইস্তফা না-দিলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন নজির তৈরি হবে।
মমতা সরকারের মেয়াদ কত দিনের
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৭ মে বৃহস্পতিবার। ইস্তফা না-দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দিন পর্যন্তই মমতা বন্দোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু ৭ তারিখ পেরোলেই তার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না-দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
ভোটে হারলে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়াটা ‘নিয়ম’ নয়। এটি সাধারণভাবে রেওয়াজ, রীতি বা সাংবিধানিক শিষ্টাচার। যেমন ১৫ বছর আগে।
২০১১ সালের ১৩ মে দুপুর ১টার দিকে ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে তৎকালীন রাজ্যপাল এমকে নারায়ণনের সঙ্গে দেখা করে ইস্তফাপত্র তুলে দিয়েছিলেন।
শুধু তা-ই নয়, তিনি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন দলের গাড়ি চেপে।
৯ মে-ই হতে পারে ‘গেরুয়া’দের শপথ
বিজেপি নতুন সরকার গঠন করবে। কিন্তু কবে সেই সরকারের শপথ হবে তা মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা থেকে একটি ইঙ্গিত মিলেছে যে, বিজেপি আগামী ৯ মে শনিবার রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন শপথগ্রহণ করতে পারে।
রাজ্য বিজেপির বিভিন্ন সূত্র থেকেও তেমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বুধবার রাতে কলকাতায় আসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। রাতেই তিনি বিজেপির পরিষদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করে নেতার নাম ঘোষণা করতে পারেন।
যিনি পরিষদীয় দলের নেতা হবেন, তিনিই হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। তিনিই রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আর্জি জানাবেন। তার পর হবে শপথগ্রহণ।
যদি ৮ মে শপথগ্রহণ হয় এক রকম, তা হলে ৭ তারিখে সরকারের মেয়াদ শেষ এবং ৮ তারিখে শপথগ্রহণের মধ্যে কোনও ফাঁক থাকবে না। তা না হয়ে ৯ তারিখ বা তার পরের কোনও দিনে শপথগ্রহণ হলে মধ্যবর্তী স্বল্পসময় রাজ্যপাল পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবেন। এবং তা হবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে।
শপথ গ্রহণ বিলম্বিত হলে কী হবে?
কলকাতা হাই কোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘তদারকি’ (কেয়ারটেকার) মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজ্যপাল কাজ চালানোর অনুরোধ করেন। তেমন কেউ না হলে তিনি নিজে এক-দু’দিন তদারকি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করারও সংস্থান রয়েছে।
কিন্তু সাধারণত এত কম সময়ের জন্য ‘সংকট’ না-হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা না-ও হতে পারে। তবে সবটাই নির্ভর করছে বিজেপি পরিষদীয় দল শপথের দিনক্ষণ কবে চূড়ান্ত করে তার উপরে।
কিন্তু মমতা ইস্তফা না-দিলে কোনও সংকট তৈরি হবে না। কারণ, বিধানসভার মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গেই তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। তবে প্রচলিত ‘রীতি’ না-মানায় তার ভাবমূর্তির উপর কোনও প্রভাব পড়ে কি না, তা সময় বলবে।
আনন্দবাজার’র সৌজন্যে