যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পেছনে তাকালেই গুলি:

বাংলাদেশে যেভাবে পুশইন করে বিএসএফ

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুলাই,২০২৬, ০৯:৩১ পিএম
বাংলাদেশে যেভাবে পুশইন করে বিএসএফ

পোল্যান্ড–বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থীদের বারবার পুশব্যাকের ঘটনা নিয়ে নির্মিত বাস্তবধর্মী ও আবেগঘন চলচ্চিত্র অনেকের হাততালি কুড়িয়েছে। কিন্তু নাগরিকদের পুশইনের ঘটনা নিয়ে এখনো কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। হতভাগ্য সোনালী খাতুন ও সুইটি বিবিদের জীবনের এক বছর চৌদ্দ দিনের কাহিনি কোনো অংশেই কম মর্মস্পর্শী বা হৃদয়বিদারক নয়। এই ঘটনা গোটা ভারত এবং বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়।

২০-২১ বছর ধরে দিল্লির রোহিনী পল্লিতে থেকে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন সোনালী খাতুন ও সুইটি বিবিদের পরিবার। কিন্তু গত বছরের ২৪ জুন নেমে আসে সেই ভয়ঙ্কর দিন। রোহিনী পল্লি থেকে দানেশ শেখ ও সুইটি বিবিদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। তাদের সব প্রয়োজনীয় নথি আগেই হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা সোনালীর ডাক্তারি কাগজপত্র ও মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। হুমকি দেওয়া হয়, কথা না শুনলে সোনালীকে আলাদা করে পাচার করে দেওয়া হবে।

দানেশ শেখ বলেন, পুলিশ তার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিল। দানেশ জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে ২৫-৩০ হাজার টাকা আছে, কারণ গ্রামের বাড়ি পাইকর থেকে কোরবানি সেরে সদ্য ফিরেছেন। পুলিশ দানেশের কর্মস্থলের ম্যানেজার, এলাকার সাফাইকর্মী কারও কথাই শোনেনি। সবাই তাদের হয়ে অনুরোধ করেছিল, ছেড়ে দিন, তারা গরিব মানুষ। আম্বেদকর মেডিক্যাল হাসপাতালে মেডিক্যাল টেস্ট করার পর আদালতে তাদের হাজির করে পুলিশ মিথ্যা তথ্য জমা দিয়ে জানায়, তারা বাংলাদেশি এবং কোনো কাগজপত্র জমা দিতে পারেনি।

২৬ জুন তাদেরসহ মোট ৭০ জনকে বিমানবন্দর থেকে আসামের ধুবড়ির কাছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কুড়িগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যাম্পে বাংলাদেশিদের হাতে বাংলাদেশি মুদ্রা দেওয়া হয়। দানেশ শেখদের সঙ্গে দুজন বাংলাদেশি ছিল। একজন একটি পোস্টের কাছে নেমে যায়। আরেকজন দালাল-গোছের লোক গাড়ি থেকে তাদের মাঝপথে নামিয়ে দেয়। সেখানে বিএসএফ তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বলে।

দানেশ জানান, তখন রাত বারোটা না একটা, তা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। বর্ষাকাল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। হঠাৎ আমাদের ছয়জনকে বিএসএফের একজন বললেন, সামনে ফাঁকা জায়গা দিয়ে দৌড়ে সরাসরি চলে যাবি। পিছনে তাকালে গুলি করে দেব। ছেলে-বউ নিয়ে আমরা তাদের হাতে-পায়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম, কিন্তু তারা শুনল না। তারা বলল, সামনের জঙ্গলে বাঘমারা আসে, ওরা জানতে পারলে বিপদে পড়বি, কাঁদিস না।

এভাবে দেড় থেকে দুই দিন হেঁটে চলেছি, বলতে থাকেন দানেশ। সারারাত নারী ও শিশুদের নিয়ে জঙ্গলের পথে হাঁটা। দিনের আলো ফুটলে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে নদীর পানি আর কলা বাগান থেকে কাঁচা কলা খেয়েই জীবন বাঁচাতে হয়েছে। এরপর কুড়িগ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে সেখানে একদিন পেট ভরে খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই আশ্রয়ও টেকেনি। দানেশ বলেন, আসলে ওটা ছিল দালালের বাড়ি, যারা বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যস্থতাকারী। সেই দালালই বিজিবিকে ফোন করে আমাদের ধরিয়ে দেয়।

তারপর শুরু হয় আরেক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। দানেশ জানান, বিজিবি কর্মকর্তা তাদের কাদামাখা পোশাক দেখে বাঘমারা এলাকার চোরাশিকারি বা পাচারকারী মনে করেন। দানেশের কাছে তখন না ছিল টাকা, না ছিল কোনো নথি। তিনি শুধু হিন্দিতে নিজের নাম লিখতে পারতেন। সেটি দেখেই বিজিবি নিশ্চিত হয়, তারা ভারতীয়।

এতক্ষণ তারা পুশইনের কবলে ছিল। এবার শুরু হলো পুশব্যাক। সেই দালাল আবার তাদের দায়িত্ব নিয়ে বিজিবিকে জানায়, সে সব ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু কিছুটা হেঁটে কুড়িগ্রামের একটি ফাঁকা পথ দেখিয়ে দালাল বলে, সোজা হাঁটবে। আধা ঘণ্টা গেলেই আমার লোক থাকবে। সেই তোদের সীমান্ত পার করে দেবে। যেহেতু আমরা টাকা দিতে পারিনি, তাই সে আর সঙ্গে গেল না। বহু অনুরোধ করেও কোনো লাভ হলো না।

বিএসএফ হেডলাইটের আলোয় তাদের যথারীতি দেখে ফেলে চিৎকার করে ওঠে, ‘রুক, রুক। গুলি করে দেব।’ ক্যাম্পে নিয়ে লাঠি দিয়ে আমাকে বেধড়ক মারধর করা হয়, বলেন দানেশ। লাঠি ও ঘুষি মারা হয়। বন্দুক দিয়ে আঘাত করতে গেলে আমি সরে যেতেই সেই আঘাত লাগে আমার ছোট ছেলে সাবের শেখের মাথায়।

সোনালীকে থাপ্পড় মারা হয়। সন্তানসম্ভবা হওয়ায়ও তাকে ছাড় দেওয়া হয়নি। সুইটিকেও চড়-থাপ্পড় মারা হয়। পরে আমার জামা খুলে পিঠের মারধরের দাগ দেখে ওষুধ দেয়। খাবারও দেয়। তারপর রাত বারোটার দিকে গাড়িতে তুলে আবার একটি জায়গায় নামিয়ে দেওয়া হয়।

দানেশ বলেন, বিএসএফ সীমান্তে হ্যালোজেনের আলো নিভিয়ে বলে, সামনের রাস্তা ধরে চলে যা। তখন বুঝলাম, আবার পুশইন। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে অন্ধকারে সবাই হাঁটতে লাগলাম। পিছনে দেশের সৈন্য, তারা আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে আছে। সামনে বিদেশি সৈন্য। আমরা কোথাকার? কোন দেশের? ঠিকানা ছাড়া, ঠিকানার খোঁজে। ছেলেরা ভয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছে।

সোনালীর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু উপায় ছিল না। ১০ কিলোমিটার হেঁটে আমরা একটি নদী পেলাম। পরে শুনেছি, ওটার নাম নাকি দুধকুমার। ভারতে একে শঙ্কোশ বলে। জিঞ্জির নৌকা টেনে পার হয়ে একটি বড় নদী দেখলাম। সেখানে বাঁশের সেতু। ধরলা নদী পার হয়ে সোনাহাটী বন্দর যাওয়া যায়। এরপর দেখলাম আরেকটি বড় নদী। এক ফোঁটা পানিও নেই। হেঁটে পার হলাম। বোধহয় ওটা তিস্তা নদী।

দানেশ বলেন, এরপর সোজা ঢাকা শহরে হাজির হলাম আমরা। একটি বাড়িতে গিয়ে বললাম, আমাদের কাছে একটি ফোন নম্বর আছে, একটু ফোন করতে দিন। বাড়ির মালিক বললেন, কাজ করো, তারপর ফোন করতে দেব। তার বাড়িতে তিন দিন রাজমিস্ত্রির কাজ করার পর একটু খেতে এবং ফোন করতে দেয়। দানেশ জানান, সুইটি বিবির মামাতো ভাই আমির খানের কাছ থেকে তিনি ঢাকার ফারুক শেখের নম্বর পান। সেই নম্বরে ফোন করার পর অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। ততদিনে সোনালী, সুইটি ও ছেলেরা হোটেলে থালা-বাসন ধোয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ফারুক শেখ একজন চিকিৎসকের ছেলে ও ব্যবসায়ী। তিনি নিজের বাড়িতে তিন-চার দিন রাখার পর তাদের একটি বাসাবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। জামাকাপড় ও খাবারের ব্যবস্থাও করে দেন। ইতিমধ্যে আমাদের কথা জানাজানি হয়ে যায়। পুলিশ আমাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়।

এরপর ভারত থেকে মোফাজিল শেখ বাংলাদেশে এসে মামলার তদবির করেন। তিন মাস দশ দিন পর সোনালী ও ছেলে সাবেরের জামিন হয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)