সুবর্ণভূমি ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ঘোষণা দিয়ে ইরানে হামলা শুরু করেছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনার মাঝে তার এই ধরনের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। পাল্টা হিসেবে ইরানও মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা শুরু করেছে।
গেল রাতে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের ৮০টি টার্গেটে ব্যাপক বিমানহামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশে আমেরিকান ঘাঁটিতে ব্যাপকমাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে ইরান।
বিবিসি ও সিএনএনের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রাতভর পাল্টাপাল্টি হামলা চলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এখন শেষ। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা জঘন্য। তারা অসুস্থ মানুষ এবং অসুস্থ মানুষেরা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা নৃশংস ও সহিংস প্রকৃতির লোক।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে তারা সেটি ব্যবহার করতো। আমার বিবেচনায়, সব শেষ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করা মানে শুধুই সময়ের অপচয়। তারা মিথ্যাবাদী।’
তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় বুধবার ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এ বক্তব্য দেওয়ার আগে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ৬০টির বেশি নৌযান। অন্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
ট্রাম্পের এ বক্তব্য দেওয়ার আগে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, তারা ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। পরে ইরান জানায়, তারাও বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে এ হামলা চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরপরই এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছিল, এ পদক্ষেপের জবাবে ‘বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে তারা। হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ ইরান মেনে নেবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় বিবৃতিতে।
পরে ইরান জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে এ হামলা চালানো হয়। পাল্টা হামলা চালানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিকতম হামলাকে আইআরজিসি যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দেয়।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তেহরানের প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইরানের গৃহীত ব্যবস্থার লঙ্ঘন, বারবার হামলার হুমকি, ইরানের তেল খাতে আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ, দক্ষিণ ইরানে হামলা এবং লেবাননে জায়নবাদী (ইসরায়েলি) আগ্রাসন অব্যাহত রাখা- এসবই সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন।’
গালফ নিউজের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ দুটিতে ওই হামলা চালানোর পাশাপাশি আইআরজিসি একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আনুষ্ঠানিক শোক ও দাফন উপলক্ষে সাত দিনের কর্মসূচি চলার মধ্যে গতকাল এ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। আগের দিন গত সোমবার হরমুজ প্রণালি ও এর কাছে তিনটি জাহাজে অজ্ঞাত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য ইরান এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। উত্তেজনার জের ধরে গতকালই বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়ে যায়।
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যা বলেছেন ট্রাম্প
যুক্তরাজ্যের সময় অনুযায়ী বুধবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ট্রাম্প ইরান বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। তখন ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, ‘যুদ্ধবিরতি কি শেষ? যুদ্ধবিরতি কি সম্পন্ন হয়ে গেছে? সমঝোতা স্মারকটি কি মুখ থুবড়ে পড়েছে?’
গত মাসে এ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
ট্রাম্প জবাবে বলেন, ‘এটি খুব আকর্ষণীয় একটি প্রশ্ন। আমার কাছে মনে হয়, এটি শেষ। আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা জঘন্য। আপনারা জানেন জঘন্য বলতে কী বোঝায়? তারা ঠিক তা-ই, জঘন্য। তারা অসুস্থ মানুষ।’
ট্রাম্প বলেন, ‘অসুস্থ মানুষেরা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা নৃশংস ও সহিংস প্রকৃতির লোক। আর তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে তারা সেটি ব্যবহার করতো। আমার বিবেচনায়, সব শেষ হয়ে গেছে।’
বক্তব্য দেওয়ার সময় ন্যাটো মহাসচিবের দিকে ইঙ্গিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা চুক্তি করি। আমি যদি তার সঙ্গে (ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতের দিকে হাত উঁচিয়ে) কোনো চুক্তি করি, তবে আমাদের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে যায়। তিনি বাইরে গিয়ে সেই কথা বলেন। কিন্তু আমরা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান) যখন চুক্তি করি, সবাই একমত হই, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না (ইরানের)।’
ইরানের সমালোচনা করে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা চুক্তি করি। আর তারা (ইরান) বাইরে যায়, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে এবং বলে, আমরা এ বিষয়ে কোনো কথাই বলিনি। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। তারা আসলে পাগল। আমার বিবেচনায়, সব শেষ।’
এরপর ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু হবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার কিছু যায় আসে না, তারা আলোচনা করতে পারে। তবে আমার মনে হয়, তারা শুধু নিজেদের সময়ই নষ্ট করছে। তারা সবাই একদল মিথ্যাবাদী লোক।’
এদিকে, বুধবার রাতেও ইরানে হামলা চালানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরে আবারও ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করা হতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প ‘সমঝোতা শেষ’ বলার পর ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড ইউনিট খাতাম আল-আম্বিয়ার সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স সতর্ক বলে বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনে যারা কোনো ধরনের সহায়তা করবে, তাদের সবাইকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে। আল-জাজিরা এই খবর দিয়েছে।