সুবর্ণভূমি ডেস্ক
খুন করে নয়, জীবিত ও অচেতন অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির বারুইপুরের সেই কিশোরীকে। সোমবার ময়নাতদন্তের যে প্রাথমিক রিপোর্ট এসেছে, তা থেকে এমনটাই অনুমান করছে পুলিশ।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে, কিশোরীর ফুসফুসে কাদা-পানি পাওয়া গেছে। সাধারণত মৃত্যুর পর মরদেহ পানিতে ফেলা হলে ফুসফুসে পানি ঢোকে না; ডুবে মৃত্যু হলেই কেবল এমনটা হওয়া সম্ভব। ফলে কিশোরীকে যখন পানিতে ফেলা হয়, তখনও সে জীবিত ছিল বলেই চিকিৎসকদের ধারণা। তবে তার আগে সে তীব্র শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, কিশোরীর শরীরে ও মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করার কারণে বা শক্ত কোনো জায়গায় মাথা ঠুকে দেওয়ার ফলে এই ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ হওয়াকেই মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা। গত শনিবার গভীর রাতে ওই কিশোরীর মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তারকৃতদের বয়ান মিলিয়ে তদন্তকারীরা গোটা ঘটনাটি পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে।
পুলিশের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে সূর্যপুর বাজারের মূল রাস্তা দিয়ে ওই কিশোরী হেঁটে যাচ্ছে। তার কয়েক কদম পেছনে লাল টি-শার্ট পরা এক যুবককে যেতে দেখা যায়। এই ফুটেজ দেখেই স্থানীয়রা ওই যুবককে প্রভাস মণ্ডল বলে শনাক্ত করেন। এরপর রবিবার সকাল সাতটার দিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি পুকুর থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, প্রভাস এলাকায় মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই ঘটনায় যুক্ত বাকিদের নাম জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে প্রভাসের দেওয়া জবানবন্দিতে বিস্তর অসঙ্গতি রয়েছে। প্রথমে তিনি ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করলেও, পরে জানান যে চারজন ব্যক্তি তার সামনে থেকে ওই কিশোরীকে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে একমাত্র আনন্দ সর্দারকেই তিনি চেনেন। আনন্দ কিশোরীকে অপহরণ করে তার বাবার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলেও দাবি করেন প্রভাস।
তদন্তকারীদের ধারণা, প্রভাস বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেছেন, আনন্দই ওই কিশোরীকে শ্বাসরোধ করে খুন করেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রভাস যদি ঘটনাস্থলে না-ই থাকবেন, তবে কে কীভাবে খুন করেছে এবং কোথায় মরদেহ ফেলা হয়েছে, তা তিনি জানলেন কী করে? শুধু প্রভাস নয়, গ্রেপ্তারকৃত বাকিদের বয়ানেও অসঙ্গতি রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, অভিযুক্তরা ঘটনার সময় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। নির্যাতনের পর কিশোরীকে খুন করার পেছনে দুটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। প্রথমত, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তরা একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় কিশোরী হয়তো তাদের চিনে ফেলেছিল। তাই প্রমাণ লোপাট করতে তাকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয়ত, শনিবার রাত আটটা থেকে যখন কিশোরীর খোঁজ শুরু হয়, সেই খবর অভিযুক্তদের কানে পৌঁছায়। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা কিশোরীর মাথায় আঘাত করে এবং সুযোগ বুঝে পুকুরে ফেলে দেয়। ময়নাতদন্তকারীদের ধারণা, মাথার আঘাত গুরুতর হলেও পুকুরে ফেলার সময়ও কিশোরী জীবিত কিন্তু অচেতন ছিল। নির্যাতিতার এক প্রতিবেশী জানান, 'তার দিয়ে বাঁধা বস্তাটি ছেঁড়া ছিল। নিশ্চয়ই শেষ মুহূর্তে বেঁচে ফেরার একটা চেষ্টা করেছিল মেয়েটি।'
এদিকে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হয়েছেন স্থানীয়রা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।