স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
দেশের নৌপরিবহন খাতকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী নৌযান শুমারি ২০২৬ পরিচালনা করতে যাচ্ছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
এরই মধ্যে লিস্টিং ও ম্যাপিং কার্যক্রমে দুই লাখ ৪৪ হাজার ৮০৮টি ইঞ্জিনচালিত নৌযানের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
আগামী ২০ থেকে ২৯ আগস্ট দেশব্যাপী শুমারির মূল তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এর আগে গত ৪ থেকে ১৭ মে লিস্টিং ও ম্যাপিং, জুলাইয়ে জোনাল অপারেশন এবং চলতি আগস্টের ৩ ও ৪ তারিখে পাইলট অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। এসব কার্যক্রমে পাওয়া তথ্য যাচাই ও হালনাগাদ করেই মূল শুমারির মাঠপর্যায়ের কাজ পরিচালিত হবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত নৌযান শুমারি ২০২৬-এর অবহিতকরণ সভায় এসব তথ্য জানানো হয়।
সভায় পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে শুমারির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবুল হোসেন। তিনি জানান, দেশের নৌপরিবহন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকা বিচ্ছিন্ন তথ্যকে সমন্বিত করে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করাই এই শুমারির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
শুমারির আওতায় দেশের সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ জলসীমায় চলাচলকারী সব ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান অন্তর্ভুক্ত হবে। ডাম্ব বার্জ এবং নিজস্ব ইঞ্জিন না থাকলেও অন্য যন্ত্রচালিত নৌযানের সাহায্যে টেনে বা ধাক্কা দিয়ে পরিচালিত নৌযানও গণনায় আসবে। বিভিন্ন থিম পার্ক, ওয়াটার পার্ক ও রিসোর্টের কৃত্রিম জলাশয়ে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত ছোট-বড় নৌযান ও স্পিডবোটও শুমারির আওতায় থাকবে।
তবে, সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নৌযান ও জাহাজ এবং ইঞ্জিনবিহীন সাধারণ নৌকা এই শুমারির আওতায় থাকবে না।
প্রাথমিকভাবে পাওয়া দুই লাখ ৪৪ হাজার ৮০৮টি নৌযানের তথ্য দেশের নৌপরিবহন খাতের ব্যাপকতা তুলে ধরছে। তবে, মূল শুমারিতে তথ্য যাচাই ও হালনাগাদের পর এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুমারির মাধ্যমে নৌযানের সংখ্যা, ধরন, মালিকানা, বয়স, ব্যবহারের ধরন এবং এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, মাঝি, মাল্লা ও নাবিকদের বিষয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা সম্ভব হবে। এই তথ্য ভবিষ্যতে নৌপরিবহন খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে কোন অঞ্চলে কী ধরনের নৌযান বেশি রয়েছে, কোথায় নৌযান চলাচল বেশি, কোন ধরনের নৌযানের জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং কোথায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার, এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নৌনিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও শুমারির তথ্য কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নৌযান ও মালিকানার তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজে থাকলে দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত নৌযান, মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
একইসঙ্গে নাবিক ও নৌযান শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের চাহিদা নির্ধারণ, নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই তথ্য ব্যবহার করা যাবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। তিনি মাঠপর্যায়ে শুমারি কার্যক্রম সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় বলা হয়, নৌযান মালিক, শ্রমিক, মাঝি, মাল্লা ও নাবিকদের সহযোগিতা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ সম্ভব নয়। তাই মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো নৌযান যেন বাদ না পড়ে এবং একই নৌযানের তথ্য যেন একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নৌযান শুমারি পরিচালিত হচ্ছে 'নৌযানের ডাটাবেইজ তৈরি ও নৌযান ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ' প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটির মেয়াদ ২১ আগস্ট ২০২১ থেকে ২০ আগস্ট ২০২৭ পর্যন্ত।
শুমারি শেষে তৈরি হওয়া জাতীয় ডাটাবেজ ভবিষ্যতে নৌপরিবহন খাতের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। এর মাধ্যমে নৌপরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও জনবল ব্যবস্থাপনায় আরও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হবে।
অবহিতকরণ সভায় জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, নৌ পুলিশ, মৎস্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর মোহাম্মদ আসিফ উদ্দীন, নওয়াপাড়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রনজিত কুমার সেন, বাংলাদেশ স্কাউট যশোরের সম্পাদক মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম, দৈনিক সুবর্ণভূমির সম্পাদক ও প্রকাশক এবং চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপু, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নওয়াপাড়া শাখার মোহাম্মদ ইকবাল সরদার, পুলিশ পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম এবং নওয়াপাড়া নদীবন্দর, অভয়নগরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।