সম্পাদকীয়
জাতীয়তাবাদী ঘরানার চিকিৎসক সমাজ আজ এক কঠিন দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত অধিকার ও মানবিক আদর্শের প্রতীক। বিগত ফ্যাসিবাদী জমানায় এই সংগঠনে সম্পৃক্তদের কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। ত্যাগের প্রকৃত পরীক্ষা মূলত সেসময়ই হয়ে গেছে। এখন অনুকূল সময়ে সংগঠনটির অভ্যন্তরে যা ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। ‘সাংগঠনিক পুনর্জাগরণ’ নাকি ‘সুবিধাবাদীদের ভিড়’- এই বিতর্ক শুধু যশোরের নয়, বরং সারা দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর জন্য একটি আত্মপরীক্ষার বার্তা বহন করে।
গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনে সাধারণ মানুষ যেমন স্বস্তি পেয়েছেন, তেমনি কিছু সুযোগসন্ধানী মহলও নতুন করে নিজেদের গুছিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর সে কারণেই যশোর ড্যাবের পুরনো ও নিবেদিতপ্রাণ নেতারা যখন বলছেন, ‘যারা স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন, তারা আজ ড্যাবের জার্সি পরে নেতৃত্বের দাবি করছেন’- তখন তা উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। যদিও বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা না করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো ফলাফল না-ও দিতে পারে।
প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বলছে, ২০১০ সালে গঠিত শেষ কমিটির পর ড্যাব যশোর জেলা শাখা প্রায় দশ বছর ধরে কার্যত নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়া ব্যক্তিরা এতোদিন কোথায় ছিলেন? যারা দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরাচারের ছায়ায় থেকে স্বাচিপ বা সরকারপন্থী কার্যক্রমে লিপ্ত ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে ত্যাগী ড্যাব নেতাদের বদলি, হয়রানি এবং চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে, সেই একই চিকিৎসকরা আজ ‘ভোল পাল্টে’ যদি ড্যাবের ‘মূলধারায়’ সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তাহলে সুবিধাবাদিতারই বিজয় হয়।
গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত যেকোনো সংগঠনে নতুন মুখ আসবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। আগত ব্যক্তির আমলনামা যদি সংগঠনের আদর্শবিরোধী কার্যক্রমের সাক্ষ্য দেয়, তাহলে সেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুবই সমীচীন। আজ অনেকেই নেতা হতে পারেন, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে শত নির্যাতন সয়েও যারা সংগঠন আঁকড়ে ছিলেন, তাদের উপেক্ষা করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানে ড্যাবের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক যেভাবে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘যারা পটপরিবর্তনের পর সক্রিয় হয়েছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার কোনো ইচ্ছা কেন্দ্রের নেই’- এটিই সঠিক সাংগঠনিকে পদক্ষেপ। এই বার্তা স্বস্তির, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখাতে হবে।
সংগঠন বড় হলে সদস্য সংখ্যা বাড়ে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সংগঠনের আদর্শ ও ইতিহাসকে মুছে ফেলে সুবিধাবাদীদের ভিড়কে ‘পুনর্জাগরণ’ আখ্যা দেওয়া ধাপ্পাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। ড্যাবে এখন বহু চিকিৎসকের ভিড় জমেছে, ভবিষ্যতে হয়তো তা আরও বাড়বে। এখনই সময় আদর্শিকভাবে দেউলিয়াদের হটিয়ে দেওয়া। যারা অন্ধকারে মশাল বহন করেন, তাদেরই প্রথম আলোয় স্থান পাওয়া উচিত। নয়তো সুযোগের অপেক্ষায় থাকা সুবিধাবাদীরা সেই মশাল নিজের হাতে নিয়ে নেবে। তেমনটি হলে তা আর আদর্শিক সংগঠন থাকবে না, হয়ে উঠবে নিছক ক্ষমতাচর্চার একটি ক্লাব।
পুনর্জাগরণ যদি সত্যি হয়, তবে তা হোক সৎ, সাহসী ও ত্যাগীদের হাত ধরে।