বিশেষ সম্পাদকীয়
আজ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান জয়যুক্ত হয়েছিল। তড়িঘড়ি পালিয়ে গিয়ে জীবন রক্ষা করেছিলেন জাতির ঘাড়ে চেপে বসা ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা ও তার বহু অপকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার শেখ রেহানা। পতন ঘটেছিল ফ্যাসিবাদী রেজিমের; যারা বিনাভোট, জালিয়াতির ভোট, রাতের ভোটের মাধ্যমে সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসন চাপিয়ে দিয়েছিল। শুধু সাড়ে ১৫ বছর বললেও ঠিক হয় না। এর আগে ওয়ান-ইলেভেনের যে সরকার দুই বছর দেশ শাসন করেছিল, তার দায়ও মূলত আওয়ামী লীগেরই। বিরাজনীতিকরণের সেই সময় থেকে রাজনীতিকসহ সাধারণ মানুষের ওপর যে নিপীড়ন শুরু হয়েছিল, তা প্রলম্বিত হয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয় হাসিনার শাসনের শেষ সময়ে।
হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তার দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুযোগমতো দেশ ছেড়ে পালান, অন্যরা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। হাসিনা সরকারের এই সব ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন একেকজন গডফাদার। মূলত আওয়ামী লীগ শেষ দিকে এসে আর রাজনৈতিক দল ছিল না। পরিণত হয়েছিল গুন্ডাপান্ডা ও লুটেরা-ডাকাতদের একটি চক্রে। তাদের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর খুন-খারাবি, গুম, নিপীড়নের চরম নিদর্শন দেখা ও সহ্য করতে বাধ্য হয়েছিল দেশবাসী। পরে ফুঁসে ওঠা জনতার রুদ্ররোষে পড়ে ক্ষমতা হারাতে হয় তাদের।
জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন। ছাত্রদের নেতৃত্বে এই গণঅভ্যুত্থানে নারী-পুরুষ-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নেয়; যা ইতিহাসে বিরল। পলাতক ফ্যাসিস্টদের বড় অংশ লুটপাটের টাকায় এখন প্রতিবেশি দেশে আয়েশে জীবনযাপন করছেন। তারা সেখান থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চক্রান্ত করছেন বলেও অভিযোগ আছে।
ফ্যাসিবাদী শাসন পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেড় বছর ক্ষমতায় ছিল, তারা দুঃশাসকদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। সেই প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত আছে। তবে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা মানুষকে হতাশ করছে। আবার ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি যেভাবে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করেছে, সেটিও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের সঙ্গে মানানসই ছিল না।
নির্বাচনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে তারেক রহমানের দল বিএনপি নিপীড়ন-নির্যাতনের আওয়ামী শাসনামলের চিত্র বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তৃণমূলে তাদের কিছু নেতাকর্মীর আচরণ ভীষণ সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাছাড়া ড. ইউনূস সরকারের সময় প্রণীত রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়েও দলটির অবস্থান নিয়ে জনমত দুই ভাগে বিভক্ত। ফলে জুলাই স্পিরিট সরকার কতটুকু ধারণ করছে বা করতে পারছে, তা নিয়েও সমাজে নানা বিতর্ক আছে। বিতর্ক জারি থাকাটাই একটি সজীব গণতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য। দেশবাসীর সীমাহীন প্রত্যাশা রয়েছে বিএনপির কাছে। সরকারের দায়িত্ব পালনকাল এখনও ছয় মাস পোরেনি। আমরা প্রত্যাশা করবো, দেশ পরিচালনায় সরকার জুলাই স্পিরিটকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরবে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার প্রাণের দাবি ছিল, এই দেশটাকে স্বাধীন দেশের মতো চলতে হবে। কারণ, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশকে যেন ভারতের একটি প্রদেশ বানানো হয়েছিল। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে গণভিত্তিহীন হাসিনা মসনদ আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন। তাই তো শেখ হাসিনাসহ সেই সময়ের সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুখ দিয়ে বেরতো, ‘ভারতকে আমরা যা দিয়েছি, তা তারা কোনো দিন ভুলতে পারবে না।’ তাদের এই কথা যথার্থ ছিল। ভারত আসলেই ভৃত্যসুলভ হাসিনা রেজিমকে ভুলতে পারেনি। বিতাড়িত স্বৈরশাসকই এখনও সেই দেশের কর্ণধারদের কাছে ‘বাংলাদেশের প্রকৃত প্রতিনিধি’।
লক্ষ্যণীয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে যেসব স্লোগান আন্দোলনকারীদের মুখে মুখে ফিরতো আর দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতো, তার মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ‘দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’। এই উচ্চারণের মাধ্যমে এদেশের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছিল, মোদিরাজ্য হাসিনার যতই পেয়ারের হোক না কেন, বাংলাদেশের মানুষ তা মানে না।
ড. ইউনূস সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমরা অনেক সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু স্বাধীন দেশের জন্য একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের যে ধারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন, মাঝে তার বিচ্যুতি ঘটলেও ড. ইউনূস এসে সেই ধারাকে বেগবান করেন। নির্বাচিত সরকারের শুরুটাও তেমনই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথা ভেঙে প্রথম ভারত নয়, মালয়েশিয়া ও চীনে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন। বেকায়দায় পড়া ভারত সরকার এখন বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও চাণক্যবুদ্ধির প্রয়োগ লক্ষণীয়। আমন্ত্রণপত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদবি উল্লেখ করা হয়নি। বিএনপি ও তারেক রহমান এই বাস্তবতায় ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন না বলে আভাস মিলছে এবং এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
প্রতিবেশি বদলানোর যে সুযোগ নেই, তা আমরা ভুলে যাইনি। কিন্তু কাঁটাতারে ফেলানির ঝুলন্ত লাশ, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা, বাংলাদেশকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের ল্যান্ডলকড রাজ্যগুলোতে চলাচলের সুবিধা আদায় ও বিনিময়ে নেপাল-ভুটানে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে করিডোর না দেওয়া, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে গঙ্গা-তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করা, বাংলাদেশে অবাধ রপ্তানির সুযোগ নেওয়া ও বিপরীতে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, বাংলাদেশের জলসীমাকে নিজেদের বলে দাবি করা, এদেশের দাগি অপরাধীদের পেলেপুষে রাখাসহ হেন কোনো শত্রুতা নেই, যা ভারত করে না। এহেন প্রতিবেশির চোখে চোখ রেখে কথা বলার হিম্মত যে ড. ইউনূস ও তারেক রহমান দেখিয়েছেন ও দেখাচ্ছেন, তা জুলাইয়েরই অবদান বললে ভুল হবে না।
অন্যদিকে, নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসন অলংকৃত করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট; যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের নবগঠিত দল এনসিপিও রয়েছে। জামায়াত এই নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা ফল অর্জন করে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে তাদের অন্তত পাঁচ এমপিকে নিয়ে সমাজে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা দলটির ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নৈতিকতার উচ্চ মানদণ্ড রক্ষার দাবি করে আসা দলটির প্রতি জনআস্থা ভীষণভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে। এর বাইরে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে জাতীয় সংসদে জামায়াতের ভূমিকা এখন পর্যন্ত মোটাদাগে প্রশংসনীয়। জুলাই স্পিরিটের আলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষে দলটি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনে নিজ দল থেকে একজন নারীকেও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন না দেওয়া জামায়াতের মধ্যযুগীয় চিন্তার বহিঃপ্রকাশ করে বলে সমালোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির শীর্ষ কযেক নেতার লাগামছাড়া বক্তব্য মানুষের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করছে। তরুণ এই নেতারা নায়কের অবস্থান হারাচ্ছেন দ্রুত। মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল গড়ার ঘোষণা তারা আগেই বিসর্জন দিয়েছেন জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক ফার রাইটিস্ট দলের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য গড়ে। রাজনীতিতে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত হতে হলে আগের ভুল থেকে তাদের দ্রুত সরে আসতে হবে। দলীয় নেতাদের চরম আক্রমণাত্মক বক্তব্য থেকেও বিরত থাকতে হবে। তারেক রহমানের শালীনতা, ভদ্রতার বিপরীতে উগ্র কথাবার্তা মানুষ গ্রহণ করছে না- একথা তাদের বুঝতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল সংখ্যক মানুষের আত্মত্যাগ এই জাতি কখনও ভুলবে না, যেমন ভোলেনি মহান মুক্তিযুদ্ধকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে পণ্য বানিয়ে আওয়ামী লীগ ফেরি করেছে, তা মানুষ সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন জুলাইয়ের চেতনাকেও যদি কেউ একইভাবে ব্যবহার করতে চান, তা-ও প্রত্যাখ্যাত হবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।
জুলুমের শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই যদি জুলাইয়ের মূল স্পিরিট হয়, তাহলে তা প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নিয়ে আসাটা রাজনৈতিক দলের কাজ। সেই কাজে সফল হতে না পারলে এদেশে দুর্বৃত্তনিয়ন্ত্রিত আওয়ামী লীগের পুনরাবির্ভাব ঘটা অসম্ভব নয়। তা যদি আমরা না চাই তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সুচিন্তিতভাবে পা ফেলতে হবে।
একাত্তর প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগে আমাদের পূর্বসূরিদের ঘটানো রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাস। এই ইতিহাস আমরা ভুলতে পারি না। আর চব্বিশ হলো জীবনদান আর সাহসের তরতাজা সমসাময়িক উদাহরণ। একাত্তরের চেতনাকে ধ্বংস করার শাস্তি আওয়ামী লীগ পেয়েছে। চব্বিশের স্পিরিট যারা ধ্বংস করবে তারাও যেন একই শাস্তির জন্য অপেক্ষা করেন।
আমরা বিশ্বাস করি, ন্যায় ও ইনসাফের জন্য রক্তদান কখনও বৃথা যায় না। একাত্তর যেমন আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছে, চব্বিশও তেমনি উপহার দিয়ে নতুন বাংলাদেশ। এই নতুন বাংলাদেশকে সামনে অগ্রসর করার গুরুদায়িত্ব রাজনীতিকদের পাশাপাশি সমগ্র দেশবাসীকে নিতে হবে। শৌর্য-বীর্যে অসাধারণ জাতি নিশ্চয় সেই দায়িত্ব পালনে সফল হবে। মহান গণঅভ্যুত্থান দিবসে এটিই আমাদের প্রত্যাশা।