সম্পাদকীয়
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কাছে শিশু অপরাধী নয়, বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের যোগ্য নাগরিক। সেই দর্শনকে সামনে রেখেই প্রণীত হয়েছে শিশু আইন, ২০১৩ এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো। এই কেন্দ্রগুলোর উদ্দেশ্য শিশুদের শাস্তি নয়; তাদের শিক্ষা, মানসিক পরিচর্যা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ঘটনাবলি এই আদর্শ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
২০২০ সালের ১৩ আগস্ট কেন্দ্রে তিন কিশোরের মৃত্যুর ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হয়, এটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশে সংঘটিত নির্যাতনের ফল। তারপরও কেন্দ্রের পরিবর্তন হয়নি বলেই মনে হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার এক কিশোরের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। আত্মহত্যার পাশাপাশি আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। একের পর এক মৃত্যু প্রমাণ করে, কেন্দ্রের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট অবহেলা করছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো কেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও সেখানে আটকে রাখার ঘটনা। শিশু আইনের মূল লক্ষ্য হলো শিশুর বিকাশ নিশ্চিত করা এবং তাকে দ্রুত সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় অনেক শিশু বছরের পর বছর কেন্দ্রে ‘বন্দী’ থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও তারা কেন্দ্রে অবস্থান করতে বাধ্য হয়, যা তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন এবং স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মীরা একে ‘অবৈধভাবে আটকে রাখা’ বলে অভিহিত করেছেন এবং শিশু বিচারব্যবস্থার গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এছাড়া, ধারণক্ষমতার চেয়ে ৬৩ শতাংশ বেশি শিশুকে নিয়ে কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পর্যাপ্ত কাউন্সেলর ও মনোসামাজিক সহায়তার অভাবে শিশুরা তাদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে না এবং পুনরায় হিংসাত্মক আচরণে লিপ্ত হয়। সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ শিশুদের শাস্তিমূলক পরিবেশে আবদ্ধ রাখতে ব্যস্ত, অথচ আইনের দর্শন হলো, তাদের পুনর্বাসন।
যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন, অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পরিসংখ্যান ও শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান সেই দাবিকে দুর্বল করে। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক বলছেন, শিশুদের অবস্থান সম্পূর্ণ আদালতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আদালতের ডাক না পাওয়া পর্যন্ত শিশুকে কেন্দ্রে আটকে রাখার কোনো নৈতিক ভিত্তি আছে কি না, সেই প্রশ্ন করাই যায়। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র তথা সমাজসেবা অধিদপ্তর কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না জানা যায় না। আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকা মানে এই নয় যে, শিশুটির উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্র অব্যাহতি পাবে।
শিশু আইনের মূল লক্ষ্য পূরণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। কেন্দ্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর ও মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ, শিশুদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত কারাগারে স্থানান্তরের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের নামে শাস্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা মানে সেই ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে দেওয়া। রাষ্ট্রের উচিত শিশু আইনের চেতনাকে বাস্তবে রূপায়ণ করা এবং যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণে নজর দেওয়া।