যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নির্যাতন, ব্যবস্থাপনার সংকট
সরোয়ার হোসেন
, যশোর
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে যেসব আইন ও নীতি প্রণিত হয়েছে তাতে রাষ্ট্রের কাছে শিশু অপরাধী নয়, বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের যোগ্য নাগরিক। সেই লক্ষ্যেই শিশু আইন, ২০১৩-এর আওতায় পরিচালিত হয় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো। এখানে অবস্থানকারী শিশুদের শাস্তি নয়; শিক্ষা, মানসিক পরিচর্যা, কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।
ছেলেদের জন্য স্থাপিত দেশের দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি হলো যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র। এখানে গত কয়েক বছরে হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে; যা যে লক্ষ্য নিয়ে এই কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়, তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, পুলিশি তদন্ত, আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র এবং সরকারি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কেন্দ্রটিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো হলো- অবস্থানরত শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা, ধারণক্ষমতার চেয়ে বাড়তি শিশুর অবস্থান, শৃঙ্খলা রক্ষার নামে সহিংসতা, পর্যাপ্ত মনোসামাজিক সহায়তার অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পরও অনেককে কেন্দ্রে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে বাধ্যও হতে হয়, যা তার অধিকারকে লংঘন করে। একইসাথে তার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
তবে, কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুরুল হাসান বলছেন, আগের অনেক সমস্যার সমাধান ইতিমধ্যে হয়েছে।
শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার বড় ধাক্কা
২০২০ সালের ১৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নাঈম হোসেন, পারভেজ হাসান রাব্বী ও রাসেল হোসেন নামে তিন কিশোরের মৃত্যুর ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পর প্রথম দিকে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ সেখানে বন্দীদের মধ্যে সংঘর্ষের কথা বলা হলেও, পুলিশি তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র।
তদন্তে অভিযোগ করা হয়, কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নির্দেশে একদল কিশোরকে মারধর করা হয় এবং সেই নির্যাতনের ফলেই তিনজনের মৃত্যু ঘটে। পরে পুলিশ মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তদন্তে ১৩ জনের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে কর্মকর্তা এবং প্রাপ্তবয়স্ক বন্দীর (নানা অভিযোগে এই কেন্দ্রে পাঠানো) পাশাপাশি কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুরুল হাসান জানিয়েছেন, মামলাটি চলমান। ওই মামলার আসামি সবাই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
এছাড়া, ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রের আবাসিক ভবনের কক্ষ থেকে জহুরুল ইসলাম নামে এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের দাবি জহুরুল ইসলাম আত্মহত্যা করেছিল। গলায় দড়ি দেওয়া তার লাশ কক্ষের সিলিং ফ্যানে ঝুঁলছিল।
এর আগে ২০২১ সালের ৯ জানুয়ারি কেন্দ্রে নিজের কক্ষে কাপড় ধোয়ার গুড়া সাবান খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এক শিশু। সেসময়কালে কেন্দ্রটিতে অন্তত আরও সাত শিশুর আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালানোর অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
দীর্ঘ সময় ও প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরও কেন্দ্রে অবস্থান
আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের আলোচনার একটি বিষয় হলো, শিশু হিসেবে কেন্দ্রে পাঠানো কোনো ব্যক্তি বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় বা আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না আসায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পরও সেখানে থেকে যেতে পারেন কি না।
এই বিষয়ে প্রতিটি ঘটনার আইনগত অবস্থা আলাদা। কারও বিরুদ্ধে বিচার চলমান থাকতে পারে, কারও আদালতের নির্দেশ কার্যকর হতে দেরি হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতাও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অবস্থানকারী শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। কেউ কেউ এটিকে ‘অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে’ বলে মনে করেন। তারা মনে করেন, বাস্তবতা শিশু বিচারব্যবস্থার গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে এবং তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষণে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের বিষয়টি উঠে এসেছে। যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালকের দেওয়া তথ্যে (১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত) দেখা যায়, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ছয় মাসের কম সময় ধরে রয়েছে ২৪৭ জন, ছয় মাস থেকে এক বছর ৩৩ জন, এক থেকে দুই বছর ১২ জন এবং দুই বছরের বেশি সময় ধরে রয়েছে ছয়জন।
অর্থাৎ কয়েকজন আবাসিক দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
তবে, আদালতে হাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ১০৩ জনকে একবারও আদালতে হাজির করা হয়নি, ৮৬ জন একবার, ৭৬ জন দুইবার এবং ৩৩ জন তিনবার বা তার বেশি আদালতে হাজির হয়েছে। অন্যদিকে ১৩ জনের পিটিআই রিপোর্ট দাখিলের পর আর হাজিরা হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বিষয়গুলোতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কোনো দায় আছে বলে মনে করেন না যশোর কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুরুল হাসান। তিনি বলেন, শিশুদের কেন্দ্রগুলোতে থাকা বা না থাকা সম্পূর্ণ আদালতের ওপর নির্ভর করে। তারা আদালতের নির্দেশেই এখানে আসে আবার আদালতের নির্দেশেই এখান থেকে বেরিয়ে যায়।
জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী যাদের বয়স ১৮ এর বেশি হয়ে যায় তাদের বিষয়ে সাথে সাথে আদালতকে অবহিত করা হয়। আদালত নির্দেশ দিলেই মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া বয়ঃপ্রাপ্তদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়। এটা চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমানে কেন্দ্রটিতে যে সাতজনের বয়স ১৮ হয়ে গেছে তাদের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট আদালতকে অবহিত করা হয়েছে।
যশোর কেন্দ্রে ১০৩টি শিশু রয়েছে, যারা এই কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করার পর আর একদিনও আদালতে যেতে হয়নি। এটি কেন হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালত ডাকেনি তাই যায়নি। এটা আরও ভালো বলতে পারবে শিশুদের অভিভাবক নিযুক্ত আইনজীবী এবং সরকারি আইনজীবীরা। মামলার বিষয়টি মূলত তারাই দেখেন।
শিশু অধিকারকর্মী ও যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাহমিদ আকাশ বলছেন, এই কেন্দ্রটি চারটি বিভাগের। এখানে অন্য জেলার শিশুরাও আসে। তাদেরকে অন্য জেলার আদালতে গিয়ে হাজিরা দিতে হয় বলে হাজিরা নিয়মিত হয় না। যার কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।
তিনি জানান, বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর শিশুদের কেন্দ্রে না রেখে দ্রুত আদালতে প্রেরণ, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাজিরার দিনে শিশুদের আদালতে উপস্থিত করানোসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে এক সময় যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ‘কেস ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ নামে একটি কমিটি ছিল। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন যশোরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
নিজে এই কমিটির সদস্য ছিলেন জানিয়ে অ্যাডভোকেট তাহমিদ আকাশ বলেন, ইউনিসেফের অর্থায়নে কমিটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কিন্তু, ফান্ড না থাকায় কমিটির কার্যক্রম এখন আর নেই। এতে শিশুর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং তার বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও অভিহিত করেন এই আইনজীবী-মানবাধিকারকর্মী।
তার মতে, ‘সঠিক সময়ে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সে (শিশু) হয়তো দ্রুত বের হয়ে যেতে পারতো। পরিবারের সাথে অ্যাটাচ হতে পারতো বা একটা কাজের সাথে যুক্ত হতে পারতো। নিজের জীবন নিজের মতো করে, ভালোভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পেতো। কিন্তু, মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে সে জানে না যে, তার মামলা কবে শেষ হবে। তা না হওয়ায় সে হতাশ হয়ে পড়ে। এটার প্রতিফলন হিসেবে আত্মহত্যার চেষ্টাসহ নানা ঘটনা ঘটায়।’
মামলার ধরন
মামলার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি হত্যা মামলার আসামি ৬৬ জন রয়েছে যশোরের এই কেন্দ্রটিতে।
এরপর রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় ৪৩ জন, মাদকদ্রব্য আইনের মামলায় ৪০ জন, চুরির মামলায় ৫৪ জন, মারামারির ঘটনায় ২১ জন, অপহরণ মামলায় ১৪ জন, দ্রুত বিচার আইনের মামলায় একজন, বিশেষ ক্ষমতা আইনে একজন, অস্ত্র মামলায় একজন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি/সাইবার-সংশ্লিষ্ট মামলায় পাঁচজন, পর্নোগ্রাফি আইনে দুইজন, সাজাপ্রাপ্ত চারজন, নিরাপদ হেফাজতে তিনজন এবং অন্যান্য মামলায় ২১ জন।
আদালতে বিচারাধীন ও দণ্ডপ্রাপ্তের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৯১ জনের বিচারাধীন মামলার রেকর্ড এবং চারজন দণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এছাড়া অভিভাবকের মামলায় বিচারাধীন একজন এবং নিরাপদ হেফাজতে তিনজন রয়েছে (এখানে একজন আবাসিকের একাধিক মামলা থাকায় মামলাভিত্তিক সংখ্যা মোট আবাসিকের সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে)।
অতিরিক্ত ধারণক্ষমতাই কি ঝুঁকির অন্যতম কারণ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের আবাসন ব্যবস্থা ১৫০ জনের। তিন তলাবিশিষ্ট এই কেন্দ্রটিতে এতদিন মাত্র দুটো ফ্লোরে আবাসনের ব্যবস্থা ছিল। ২০২০ সালের ঘটনার পর তদন্ত কমিটি যে যে সুপারিশ করেছিল, তার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ নিচতলা সংস্কারের মাধ্যমে শিশুদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জানান, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল এবং রংপুর বিভাগের ৩২টি জেলা থেকে শিশুদের পাঠানো হয়। বিভিন্ন মামলায় আটক হওয়ার পর শিশুদেরকে জেলখানায় না পাঠিতে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
বর্তমানে কেন্দ্রটিতে অবস্থান করছে ২৪৫ শিশু ও কিশোর; যা ধারণক্ষমতার ৬৩ শতাংশ বেশি। যশোর সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কাজী কাদের মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে এ চিত্র দেখা গেছে।
ওই তথ্য থেকে জানা যায়, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বর্তমানে অবস্থানকারীদের মধ্যে নয় বছরের নিচে তিনটি শিশু রয়েছে।
অন্যদের মধ্যে, ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী দুটি, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১০২টি এবং ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১৭৬ জন রয়েছে কেন্দ্রটিতে।
এছাড়া ১৮ বছরের বেশি বয়সী ১৮ জনও এই কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। একজনের বয়সের তথ্য উল্লেখ নেই। অর্থাৎ কেন্দ্রটিতে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরোর্ধ্ব) অন্তত ১৮ জন।
কিন্তু, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ১৬ জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্রটিতে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সাতজনের অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, একের পর এক সহিংসতার অন্যতম কারণ হলো ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত শিশুদের অবস্থান। যেহেতু এটি একটি সংশোধনাগার, সেহেতু এখানকার ব্যবস্থাপনা সাধারণ কাস্টডির মতো হওয়ার কথা নয়। আবার বাড়ির পরিবেশ না হলেও কড়া শাসনেরও কোনো সুযোগ নেই।
অতিরিক্ত শিশুর চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে শিশুদেরকেই শিশুদের ‘নিয়ন্ত্রণে’ ব্যবহারের পন্থা অবলম্বন করতে গিয়ে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন তারা।
শিশুদের জন্য বরাদ্দ ‘আত্মসাৎ’ করার কারণে যশোর কেন্দ্রটিতে অতীতে শিশুদেরকে ঠিকভাবে খাবার এবং অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও আছে। এসব বিষয় নিয়ে শিশুদের অনেকেই নানা সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদেরকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে গিয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা শিশুদেরকে ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ যা মনে করেন
একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় মানবাধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা শাওলী সুলতানা যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে ‘শিশুদের প্রোপার কাউন্সেলিং না হওয়া’র কারণে হতে পারে বলে মনে করছেন।
‘‘কেন্দ্রের শিশুরা দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। তাদের অভিভাবকেরাও মনে করে ‘সংশোধন হতে গেছে, হয়ে আসুক। সেক্ষেত্রে শিশুরা তাদের মনের কথা খুলে বলার মতো কাউকে পায় না। এই সময়ে কাউন্সেলররাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু, কেন্দ্রগুলোতে যেসব কাউন্সেলর রয়েছেন তারা এসব বিষয়ে কতোটা অভিজ্ঞ তা জানা জরুরি,’’ বলছেন শাওলী সুলতানা।
তার মতে, কেন্দ্রের শিশুরা যেসব ঘটনার মধ্যদিয়ে এখানে আসে তাতে তারা একটা ট্রমার মধ্যে থাকে। কাউন্সেলররা এই ট্রমা ইনফর্মড অ্যাপ্রোচে (একজন মানুষের ট্রমা জানা, বোঝা এবং সেভাবে তার সাথে ডিল করা) অ্যাড্রেস করতে পারে না। এ কারণে অনেক সময় শিশুকে তার ওপর উত্থাপিত অভিযোগের নানা দিক নিয়ে খোঁচা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে শোনা যায়। এতে ওই শিশু আবারও হিংসাত্মক আচরণ করতে পারে।
তিনি মনে করেন, প্রোপার কাউন্সেলিং হলে কোন শিশু নিজের আচরণকে সঠিকভাবে সংশোধন করতে পারে।
উল্লেখ্য, কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ১৮০ জন শিশু-কিশোর সশরীরে বা ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। তবে ২৯৫ জনের ক্ষেত্রে অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগের তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে।
সংশোধনাগার নাকি শাস্তিমূলক পরিবেশ
শিশু আইন অনুযায়ী উন্নয়ন কেন্দ্রের মূল দর্শন পুনর্বাসন। সেখানে শিক্ষা, কাউন্সেলিং, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়ার কথা। কেন্দ্রটির ঘোষিত কার্যক্রমের মধ্যেও রয়েছে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন।
সরকারি ওয়েবসাইটেও মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও আদালতের আদেশ অনুযায়ী পুনর্বাসনের বিষয়গুলো কেন্দ্রের প্রধান কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জানিয়েছেন, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বর্তমানে ইলেট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, কম্পিউটার এবং ফুড প্রসেসিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষক না থাকায় অটোমোবাইল প্রশিক্ষণ স্থগিত রয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রটির ভেতরে শৃঙ্খলা রক্ষার নামে শারীরিক নির্যাতন, ভয়ভীতি এবং অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জারি রাখা হয়েছে। অতীতে কেন্দ্রটিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কিছু শিশুকে ব্যবহার করে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল বলেও অভিযোগ আছে।
তিন শিশুকে হত্যা, একজনের আত্মহত্যা এবং আটজনের আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ঘটনা কেন্দ্রটি নিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এসব ঘটনায় ইতিপূর্বে কেন্দ্রে দায়িত্বরতরা শিশুদেরকে দায়ী করা চেষ্টাও করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সমাধানে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বেশ কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করে সেগুলো পূরণ না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন মানবাধিকার কর্মী শাওলী সুলতানা। তিনি বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক একটি বিষয়। এর সাথে রয়েছে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং জীবন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ। একটা আর একটার সাথে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, ‘শিশু সংশোধন কেন্দ্রে যাদের আনা হয়, তাদের পারিবারিক বন্ধন খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূলত ব্রোকেন ফ্যামিলি থেকে আসার সংখ্যাই বেশি। যাদের মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন নেই অথবা শিথিল। যে কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটায় এবং সংশোধন কেন্দ্রে আসে বা আনা হয়। এই কেন্দ্রে এসেও তারা সাপোর্ট পায় না। এ কারণে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং নানা ধরনের ঘটনা ঘটায়।’
তিনি বলেন, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে যদিওবা কাউন্সেলিং প্রদান করা হয় তবে তা পর্যপ্ত এবং সময়সাপেক্ষ বলার অবকাশ নেই। তিনি যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থানকারীর সংখ্যা উল্লেখ করে বলেন, মাত্র দুজন কাউন্সেলরের পক্ষে এতো শিশুকে নিবিড়ভাবে কাউন্সেলিং করা খুবই কঠিন। তারওপর জীবন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ যেমন যোগাযোগ, মানুষের সাথে কথা বলা, সমস্যার সমাধান করতে পারা, চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং রাগ নিয়ন্ত্রণের ওপর স্পেশাল সেশন হয় বলে জানা নেই।
মামলা দ্রুত ও ন্যায্য সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া খুব জরুরি এবং এটিকে শিশুর অধিকার বলে মত দিয়েছেন অ্যাডভোকেট তাহমিদ আকাশ। এক্ষেত্রে মামলার নিয়মিত তদারকি করা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কেন্দ্রগুলোর আরও সক্রিয়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।