দেশে নতুন ভেরিয়েন্ট
শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
আইইডিসিআর কর্তৃক বারবার ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির অভাব দেখা গেছে যশোর জেনারেল হাসপাতালে। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারির ভেতরে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তার দেখা মিলছে না। খোলা বেডে মশারি ছাড়াই সাধারণ রোগীদের পাশে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে তাদের। এতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শত শত সাধারণ রোগী, স্বজন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে নতুন করে ডেঙ্গু সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার সকালে যশোর জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যত নেই। রোগীরা সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকের বেডে মশারি নেই, কেউ খালি গায়ে শুয়ে বা বসে আছেন। হাসপাতালের ভেতরে এডিস মশা প্রবেশ করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও তা ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ১৩৭ জন রোগী। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঝিকরগাছা উপজেলার নন্দী ডুমুরিয়া এলাকার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ইসমাইল হোসেন কোনো মশারি ছাড়াই খোলা বেডে খালি গায়ে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পর একজন স্বাস্থ্যকর্মী এসে একই অবস্থায় তাকে ইনজেকশন ও স্যালাইন চিকিৎসা দেন। তার চারপাশেই ছিলেন সাধারণ জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য রোগে ভর্তি রোগীরা।
একই চিত্র দেখা গেছে, হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডেও। সেখানে মোট ১৭৫ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। মণিরামপুর পৌর এলাকার ডেঙ্গু আক্রান্ত ফারিহা তাসনিমকে সাধারণ নারী রোগীদের মাঝে মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। ওয়ার্ডজুড়ে রোগীদের গাদাগাদি অবস্থার কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি।
পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা মো. মুরসালিন নামে এক সাধারণ রোগী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে আসিনি। কিন্তু আমাদের পাশের বেডেই মশারি ছাড়া ডেঙ্গু রোগী রাখা হয়েছে। এতে আমরা নিজেরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছি। হাসপাতালে এসে যদি নিরাপদ না থাকি, তাহলে চিকিৎসা নেবো কোথায়? কর্তৃপক্ষের উচিত ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় রাখা।
হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি সদরের নওদাগ্রামের এক নারী রোগীর স্বজন আছিয়া বেগম বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হইনি। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীদের পাশেই থাকতে হচ্ছে। হাসপাতালে এসে এখন নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ভয় লাগছে।
একাধিক রোগীর স্বজন জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। মশারিও দেওয়া হয়নি। এতে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই জাতীয় নির্দেশনায় ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এতে হাসপাতাল নিজেই সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরেই যশোর সদর ও অভয়নগর উপজেলাকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইইডিসিআর। রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একাধিকবার তদন্ত টিমও যশোরে এসেছে। এরপরও ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান প্রস্তুতি দেখা যায়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামনে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে হাসপাতাল কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনাও নেই। সরেজমিনে কথা বলতে গিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত শুরুতে বাড়তি রোগী এলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা বিকল্প ওয়ার্ডের পরিকল্পনা কী, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বিষয়টি মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকদের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন। পরে তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মশারি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কোথাও ঘাটতি থাকলে দ্রুত তা সমাধান করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় দায়িত্বরত একাধিক চিকিৎসকের মতে, একটি রেড জোন জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ডেঙ্গু রোগীদের অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। হাসপাতালে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৩ জন। এর মধ্যে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪৬ জন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৪৬ জন, কেশবপুরে ২৬ জন, বাঘারপাড়ায় ১৫ জন, ঝিকরগাছায় ৯ জন, মণিরামপুরে ৬ জন এবং চৌগাছায় ৫ জন। এছাড়া ২২ জন রোগী চিকিৎসা শেষ না করেই হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।
গত ৪ জুলাই অভয়নগরের সোহেল হোসেন (২৯) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এটি চলতি বছরে জেলায় ডেঙ্গুতে প্রথম মৃত্যু।
পরিসংখ্যান বলছে, মে মাস পর্যন্ত জেলায় আক্রান্ত ছিলেন মাত্র ৭৯ জন। আগস্টের শুরুতেই সেই সংখ্যা বেড়ে ৩৫৩ জনে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসেই আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ হাজার ২০৫ জন। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১৬৪, আগস্টে ১৭৮, সেপ্টেম্বরে ২০৯, অক্টোবরে ৩৩২ এবং নভেম্বরে ৩২২ জন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন আট হাজার ৬৫০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। আর ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭০৭ জন।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পরীক্ষিত নমুনার ৯১ শতাংশে ডেন-৩ এবং ৯ শতাংশে ডেন-২ সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেন-৩ বিস্তারের কারণে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বেড়েছে। আগে ডেন-২ এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা এবার ডেন-৩ এ আক্রান্ত হলে ঝুঁকি আরও বেশি।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. উবায়দুল কাদির উজ্জ্বল বলেন, খালি গায়ে এবং মশারি ছাড়া রোগী থাকার বিষয়টি এখনই দেখা হচ্ছে। দায়িত্বের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, অনেক রোগীর উচ্চ জ্বর নাও থাকতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পরের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময় রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে। প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং লিভার, কিডনি ও মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই জ্বর কমে গেলেই রোগী সুস্থ হয়েছে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়।