তারেক মাহমুদ
, (কালীগঞ্জ) ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানউল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের জুন মাসে যোগদানের পর ওই মাসের শেষে কোনো মালামাল না কিনে তিনি ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কালীগঞ্জ উপজেলা সরকারি হাসপাতালের খাতওয়ারী বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি চিত্র উঠে আসে। এরমধ্যে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ এক লাখ ৮০ হাজার টাকা, অন্যান্য খরচ বাবদ এক লাখ ১০ হাজার টাকা, স্ট্যাম্প ও সিল বাবদ ২২ হাজার টাকা, অফিস সরঞ্জাম বাবদ ১৩ হাজার টাকা, সেপটিক ট্যাংক পরিস্কার বাবদ ৩০ হাজার টাকা, আসবাবপত্র মেরামত বাবদ ৩০ হাজার টাকা, আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ ৫৫ হাজার টাকা, কম্পিউটার মেরামত বাবদ ৪৫ হাজার টাকা, পরিস্কার সামগ্রী বাবদ আট হাজার টাকা এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ৫০ হাজার টাকা নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় না করে ভুয়া বিল ভাউচারে পকেটস্থ করেছেন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সীমাহীন এ দুর্নীতির তথ্য প্রমাণ এবং অডিও-ভিডিও বক্তব্য প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। বরাদ্দের অর্থ দিয়ে মালামাল ক্রয় হয়েছে কি না জানতে চাইলে হাসপাতালে স্টোরের দায়িত্বে থাকা হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবুর রহমান বিল ভাউচারে ক্রয়কৃত কোনো মালামাল দেখাতে পারেননি। বরাদ্দ না থাকায় অল্প অল্প করে কোনোরকমে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। ‘এ ব্যাপারে স্যার ভালো বলতে পারবেন’ বলেন তিনি।
এদিকে, হাসপাতালের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন সামগ্রীর অভাবে হাসপাতালে নোংরা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী চাহিদা দিলেও দীর্ঘদিন ধরে তা যথাযথভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে না।
কালীগঞ্জ হাসপাতালের এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যোগদানের পর থেকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক এবং সেবার মান ভেঙে পড়েছে। তিনি যোগদানের পর থেকেই নিয়মিত সহযোগীসহ হাসপাতালের রোগীর খাবার খাওয়া শুরু করেন। সম্প্রতি বিষয়টি সাংবাদিকদের নজরে এলে সেটি বন্ধ হয়। তার নির্দেশে হিসাবরক্ষক এখন কেবল অফিসে যান আর আসেন, কোনো কাজ করা লাগে না।
অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের এবং পরিমাণে কম খাবার রোগীদের সরবরাহ করা হলেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন না। সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে অফিসে যোগদানের সময় শুরু হলেও কোনোদিনও যথাসময়ে উপস্থিত হন না। অবশ্য শুধু তিনি একা নন, অধিকাংশ ডাক্তারই যথাসময়ে হাসপাতালের আসেন না। এমন অব্যবস্থাপনার কারণে গেল ২৫ জুলাই হাসপাতালের হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবুর রহমান সহকর্মী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জামির হোসেনকে মেরে রক্তাক্ত করেন। এরপর জামির হোসেনের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করলেও কোনা ব্যবস্থা নেননি এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
সম্প্রতি হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমার দাস অফিস ফাঁকি দিয়ে মাঠে গিয়ে বিক্রয় প্রতিনিধিদের দিয়ে কাজ করানোর ভিডিও ভাইরাল হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে রোগীদের কাছ থেকে।
কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমানুল্লাহ স্যার যোগদানের পর থেকে আমাকে হিসাব বিভাগের সমস্ত কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। যে কারণে আমি অফিসে যাই এবং আসি। এর বাইরে কোনো কিছুই আমার জানা নেই।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমানুল্লাহ আল মামুন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। কেনাকাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনি বললেন, আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখবো। বিষয়টা আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাবো।’
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যদি বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ করে থাকেন, তাহলে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাকে কিংবা অন্যকে দোহায় দিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, অনিয়ম দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।