কেশবপুর প্রতিনিধি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ঢাকার আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর গ্রামের তৌহিদুর রহমান রানা (৩০)। দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হলেও গত দুই বছরে রানার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনে নেমে এসেছে চরম অন্ধকার। উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে তাদের সব কূল গেছে।
শহীদ সন্তানের জন্য সরকারি-বেসরকারি অনুদানের সিংহভাগও চলে গেছে বিধবা পুত্রবধূর হাতে। তিনি থাকেন বাপের বাড়িতে। এমন অবস্থায় চরম অভাব-অনটন আর চিকিৎসার অভাবে দিন কাটছে শহীদ তৌহিদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। মৃত্যুর আগে সন্তান হত্যার বিচার ও শেষ জীবনে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চান এই জুলাই শহীদের পরিবার।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কেশবপুরের ভালুকঘর গ্রামের মো. জব্বার মোল্যার ছোট ছেলে তৌহিদুর রহমান রানা ও বড় ছেলে জাহিদ হাসান সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ঢাকার আশুলিয়ায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তখন রাজধানীতে অবস্থানরত দুই ভাইই রাজপথে নেমে আসেন। ৫ আগস্ট বিজয়ের দিনে আশুলিয়া থানার সামনে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে বুকে গুলিবিদ্ধ হন রানা। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিনের সংঘর্ষে বড় ভাই জাহিদ হাসানও গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
৬ আগস্ট রানার মরদেহ কেশবপুরে আনার পর স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এবং পরে ভালুকঘর গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ৭ আগস্ট রানার স্ত্রী নাসরিন আক্তার বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ৫২ জনের নাম উল্লেখ করে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা করেন; যা অনেকটা স্থবির হয়ে আছে।
শহীদ তৌহিদুর রহমানের বাবা মো. জব্বার মোল্যা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘রানা শহীদ হওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, জুলাই ফাউন্ডেশন ও বেসরকারি খাত থেকে যে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে, তার সিংহভাগই আমার পুত্রবধূ নাসরিন আক্তার কৌশলে নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়ে গেছেন। রানা শহীদ হওয়ার পর সে মাত্র একদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। এরপর তার ছয় বছরের কন্যাসন্তান আয়েশাকে নিয়ে কুষ্টিয়ায় বাপের বাড়ি চলে যায়। আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো খোঁজ নেয়নি। অথচ আমরা এই বৃদ্ধ বয়সে না খেয়ে মরার অবস্থায় পড়েছি।’
তিনি প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, সরকারি বা বেসরকারি আর কোনো অনুদান যেন রানার স্ত্রীর হাতে না দেওয়া হয়; বরং তা যেন সরাসরি বৃদ্ধ পিতা-মাতার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে জব্বার মোল্যা বলেন, ‘আমার ছেলে দেশের জন্য, দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে। বাবা হিসেবে আমি গর্বিত। কিন্তু যে খুনিদের গুলিতে আমার বুক খালি হলো, তাদের বিচার আজ দুই বছরেও হলো না। সরকারের কাছে আমার একটাই আকুতি আমার ছেলে হত্যার বিচার প্রক্রিয়া যেন দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। এই অপরাধীদের শাস্তি দেখে যেন আমরা শান্তিতে মরতে পারি।’
ছোট ছেলেকে হারিয়ে রানার বৃদ্ধা মা শাহীনা বেগম মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে পারছেন না। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী।
প্রতিবেশি ওহিদুর রহমান বলেন, রানা ও তার ভাই খুব ভালো ছেলে ছিল। দেশের জন্য রানা প্রাণ দিলো, বড় ভাই জাহিদও পঙ্গুপ্রায়। অথচ তাদের বাবা-মা আজ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অন্যদিকে পুত্রবধূ সব টাকা নিয়ে চলে গেছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, এই বৃদ্ধ পিতা-মাতার দায়িত্ব যেন রাষ্ট্র নেয়।’
এদিকে শহীদ তৌহিদুর রহমানের প্রতি সম্মান জানিয়ে কেশবপুর উপজেলা চত্বরে ‘এক শহীদ এক বৃক্ষ’ কর্মসূচির আওতায় একটি গাছের চারা রোপণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহতদের সম্মাননা জানাতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে সম্মাননার পাশাপাশি তাদের অসহায় বাবা-মায়ের স্থায়ী পুনর্বাসন ও রানার খুনিদের বিচার নিশ্চিত করাই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।