যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ফিরে দেখা ৫ আগস্ট

যশোরে বিজয় মিছিল শেষ না হতেই ঝরে যায় দুই ডজন প্রাণ

বিশেষ প্রতিনিধি

, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ৫ আগস্ট,২০২৬, ১০:০০ এ এম
যশোরে বিজয় মিছিল শেষ না হতেই ঝরে যায় দুই ডজন প্রাণ

ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের দিনে যখন আনন্দ মিছিল করার কথা, ঠিক সেই মুহূর্তে বিষাদে ভরে যায় গোটা যশোর।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে সারাদেশের মতো যশোরেও বিজয় মিছিল শুরু হয়। কিন্তু সেইসময় জেলা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারির মালিকানাধীন হোটেল জাবিরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছাত্র-জনতার আনন্দ উৎসব নিমেষেই রূপ নেয় মহাবিষাদে। আগুনে প্রাণহানি হয় শিশু, বিদেশিসহ ২৪ জনের। যদিও সেইসময় যারা উদ্ধার কাজে গিয়েছিলেন, তাদের মতে লাশের সংখ্যা আরও বেশি।

উদ্ধারকারীরা যা বললেন

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে জাবির হোটেলে আটকে পড়া মানুষের আহাজারিতে অনেকেই ছুটে যান তাদের উদ্ধার করতে। এমনই কয়েকজন জানান, আগুনে পুড়ে মরার চেয়ে অক্সিজেন সংকটে দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল বেশি।

উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘‘ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরপরই ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ আর্তনাদ শুনেছি। আটকে পড়াদের উদ্ধারে আমার ভাই সাদ তার বন্ধুর সঙ্গে উপরে চলে যায়। তার বন্ধু নেমে এলেও আমার ভাই মারা যায়। আমরা হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাচ্ছি, আবার ফিরছি। কিছুক্ষণ পরে ফোনে আমাকে জানানো হলো, সাদ মারা গেছে।”

মোহাম্মদ পরশমণি নামে আরেকজন বলেন, ‘চাঁচড়ায় সমাবেশ চলাকালে জানতে পারি, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেছে। বিজয় মিছিল বের করি। কিছুদূর আসার পর দেখতে পাই বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলি। কাছাকাছি এসে দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ। হোটেলের বিভিন্ন তলা থেকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার ধ্বনি। এরপর চলে যাই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে দিয়েছে উত্তেজিত জনতা। লোকজনকে বুঝিয়ে একটি গাড়ি নিয়ে বের হলেও তাতে পানি ছিল না। জাবিরের পেছনের দিকে লালদীঘি থেকে পানি নিয়ে সেখানে পৌঁছুলেও তখন প্রায় সব শেষ। ওইসময় একটি হেলিকপ্টার এসে একজনকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পরে জেনেছি, সেই লোক ছিলেন জাবিরের একজন স্টাফ।’

‘আগুন নিয়ন্ত্রণের পর আমরা উপরে গিয়ে দেখেছি মদের বোতল, লাশ পড়ে আছে। একজন বিদেশি (ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক) তার লাশের পাশে একটি জায়নামাজ পড়ে রয়েছে। আধুনিক এই হোটেলে অটোমেটিক আগুন নেভানোর যন্ত্র ছিল, সেগুলো কাজ করেনি। প্রায় প্রত্যেকটি ফ্লোরের দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়েছে। ঘটনার কিছুদিন পরে পুলিশের সাথে আলাপকালে শুনতে পারি, নিচে গানপাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, আগুনে জাবির হোটেলের একজনও মারা যায়নি,’ বলছিলেন পরশমণি।

অ্যাম্বুলেন্সচালক শেখ মিলন বলেন, “বিকেল ৪টার দিকে হাসপাতালে থাকাকালেই পোড়া রোগী নিয়ে আসা এক ব্যক্তি বলেন, ‘জাবিরে ব্যাপক আগুন, আপনারা তাদের উদ্ধার করুন।’ সেই কথা শুনেই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। উপরে গিয়ে দেখি, লাশ আর লাশ। পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে এমন লাশের চেয়ে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ১০-১২টি লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাই। মনে হচ্ছিল, তারা গভীর ঘুমে।”

সমন্বয়কের বক্তব্য

তৎকালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মারুফ হাসান সুকর্ণ বলেন, ‘৫ আগস্ট দুপুর নাগাদ জানতে পারি শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। আমরা বিজয় মিছিল নিয়ে বের হওয়ার পর শহরের ভেতরে ঢুকে হঠাৎ নজরে আসে আগুন ও ধোয়ার কুণ্ডলী। যখন হোটেলের কাছে পৌঁছাই, সেখানে আগুন ছাড়া আর কিছুই ছিল না।’

‘পরে জানতে পারি, সেখানে লাশ ছিল ২৫টি। যদিও উদ্ধারকর্মীদের দাবি, আরও বেশি। ঘটনার ৪-৫ দিন পর আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি, কেন এই আগুন লাগলো, কারা এই কাজ করলো। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই সত্য উদ্ঘাটন জরুরি বলে মনে করি। একমাসের বেশি সময় আমরা যশোরের রাজপথে, কিন্তু কোনো নৈরাজ্যকর ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করে কেন বিজয়ের দিনে এমন হলো- এই নৃশংস ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন ও দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিৎ,’ যোগ করেন সুকর্ণ।

মামলা ও সব শেষ অবস্থা

১৮ আগস্ট শাহীন চাকলাাদারের চাচাতো ভাই তৌহিদুল ইসলাম চাকলাদার ওরফে ফন্টু চাকলাদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর-২২।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন চিত্রা মোড়ে ১৬ তলাবিশিষ্ট ‘জাবের প্যারাডাইজ লিমিটেড’ নামে ফাইভ স্টার হোটেল রয়েছে। ৫ আগস্ট বিকেল তিনটার দিকে প্রায় ২০০ অজ্ঞাত সন্ত্রাসী অস্ত্র, গানপাউডার ও পেট্রোল নিয়ে হোটেলের মধ্যে ঢুকে প্রথমে লুটপাট শুরু করে। সন্ত্রাসীরা হোটেলের ক্যাশভোল্ট ভেঙে নগদ ৯০ লাখ টাকা, ১০০টি ফ্রিজ, ১০০টি স্মার্ট টেলিভিশন, সাড়ে চারশ’ কিলো ভোল্টের দুটি জেনারেটর, কয়েকশ’ এসি, স্টোরের মধ্যে রাখা এক হাজার কিলোভোল্টের ট্রান্সফরমার সাবস্টেশন, প্রেসার পাম্প, ফায়ার স্টেশনের মালামাল, ফায়ার ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে। পরে গানপাউডার ও পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ১৬ তলা ভবনের পুরোটা পুড়ে যায়। সেখানে অবস্থানরত একজন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক, হোটেল স্টাফসহ ২৪ জন পুড়ে মারা যায়।

মামলাটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন। ঘটনার পর বিভিন্ন সময় এই মামলায় মোট সাতজনকে আটক দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে আটক করা যায়নি। যাদের বিভিন্ন সময় আটক দেখানো হয়েছে তারা হলেন, শহরের চাঁচড়ার কাজী খালিদ হোসেনের ছেলে ইমন কাজী, শংকরপুরের তৌহিদুর রহমানের ছেলে রাকিব ওরফে ভাইপো রাকিব, বেনাপোলের দুর্গাপুর গ্রামের শামসুল হকের ছেলে এনামুল হক, অভয়নগরের প্রেমবাগ গ্রামের মৃত মোশরাফ হোসেনের ছেলে অ্যাডভোকেট সৈয়দ কবির হোসেন জনি, চাঁচড়া রায়পাড়ার মৃত রসুলের ছেলে আজাহার হোসেন স্বপন, শহরের খোলাডাঙ্গার খালেকুর রহমান টিটো ওরফে টিটো পাগলার ছেলে আশিকুর রহমান শাওন এবং শহরের পোস্ট অফিসপাড়ার মৃত তাজুল হকের ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক। আটককৃতরা সকলেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, যাদের আটক দেখানো হয়েছে এদের মধ্যে আব্দুল খালেক ছাড়া বাকি সবাই এই মামলায় জামিনে আছেন। নতুন করে কাউকে আর আটক দেখানো হয়নি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর কাজী বাবুল হোসেন জানান, এই মামলায় বিভিন্ন সময় আটক দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আইনানুগ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এখনও মামলাটির তদন্ত চলছে।

কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিল?- এই প্রশ্নে ‘তদন্ত এখনো চলমান আছে’ বলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

পিপি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু যা বলেন

‘সেদিন সকাল থেকেই গোটা দেশের পরিবেশ উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল। ফ্যাসিজমের পতন হবে, রাজপথে উপচেপড়া মানুষ। বিজয়ের প্রতিধ্বনি বাতাসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। আমজনতাকে ঠেকানোর কোনো উপায়ও ছিলও না। আমরা দলীয়ভাবে মিটিংয়ে বসেছি কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয় সেজন্য করণীয় নির্ধারণে। দুপুরে জানতে পারি, শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

অ্যাডভোকেট সাবু আরও বলেন, ‘মিটিং বন্ধ করে আমরা ছুটে যাই। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় দ্রুত সময়ের মধ্যে সবশেষ। আমরা এরপর পূজামন্দির, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে যাতে হামলা না হয়, দলীয় নেতাকর্মীদের সেদিকে সজাগ থাকতে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিই।’

তিনি বলেন, ‘জাবিরের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলা তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমরা চাই, এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা হোক। আদালতই তাদের শাস্তি দেবেন।’

জুলাই শহীদ তালিকা নিয়ে বিতর্ক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যশোরে জাবির হোটেল ট্রাজেডিতে নিহত শহীদদের তালিকা নিয়ে উত্থাপিত বিতর্কের জেরে বাদ পড়েছেন ফজল মাহাদী চয়ন। শহীদের তালিকায় তার ক্রম ৫২২। অভিযোগ, তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

গেজেট প্রকাশের পর যশোর জেলার অন্তর্ভুক্তদের মধ্য থেকে ফজল মাহাদী চয়নসহ তিনজনকে নিয়ে বিতর্ক হয়। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত চয়নসহ তিনজন স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন।

বিতর্ক উঠার পর শহীদদের তালিকা নিয়ে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট অধিশাখা থেকে গত বছরের ১৫ জানুয়ারি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এ শহীদদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় নাম ছিল শহরের মাদকপল্লী ও অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার ফজল মাহাদী চয়ন, একই এলাকার রিয়াদ শেখ। যার ক্রমনম্বর ৬৯১ এবং শহরের খড়কি কারবালা এলাকার রুহান ইসলাম, ক্রমনম্বর ৩৩৫।

জাবির হোটেলে নিহতের তালিকা

১. আ. আজিজ চাঁন (১৬), ছাত্র, চাঁচড়া, রায়পাড়া, যশোর

২. সিফাত হোসেন (২২), ছাত্র, শাখারীগাতি, যশোর

৩. সোহানুর রহমান শিহাব (২৬), ব্যবসায়ী, কিসমত নওয়াপাড়া, যশোর

৪. মো. হাফিজ উদ্দীন (৩০), দোকান কর্মচারী, বারান্দী মোল্লাপাড়া, যশোর

৫. রোকনুজ্জামান রাকিব (২২), ছাত্র, বালিয়া ভেকুটিয়া, যশোর

৬. সৈয়দ মিথুন মোর্শেদ (২৭), ছাত্র, উপশহর, বি ব্লক, যশোর

৭. ফয়সাল হোসেন (২৫), ছাত্র, পুরাতন কসবা, রায়পাড়া, যশোর

৮. শাওয়ান্ত মেহতাব প্রিয় (১৮), ছাত্র, মুজিব সড়ক, যশোর

৯. মেহেদি হাসান (১৩), ছাত্র, কৃষ্ণবাটি, যশোর

১০. সামিউর রহমান সাদ (১৭), পূর্ববারান্দি মোল্লাপাড়া, যশোর

১১. রুহান ইসলাম (১৭), ফ্রিজ মেকানিক, কারবালা বামনপাড়া, যশোর

১২. তারেক রহমান (২৮), বিকাশ কর্মচারী, বলরামপুর, রূপদিয়া, যশোর

১৩. আলামিন বিশ্বাস (২০), ছাত্র, সুজলপুর হঠাৎপাড়া, যশোর

১৪. আবরার মাসনুন নীল (১০), ছাত্র, ঘোপ নওয়াপাড়া, যশোর

১৫. ইউসুফ আলী (১৫), (পেশা উল্লেখ নেই), আদর্শপাড়া, চোরমারা দীঘিরপাড়া, যশোর

১৬. মেহেদি হাসান আলিফ (১৫),ছাত্র, তেঁতুলতলা রেলগেট, যশোর

১৭. সাকিবুল হাসান মাহি (১৫), ছাত্র, চাঁচড়া ডাল মিল, যশোর

১৮. আব্দুল্লাহ ইবনে শহীদ (২৬), চাকরিজীবী, ঘোপ নওয়াপাড়া, যশোর

১৯. রাসেল রানা (২১), মাদরাসার ছাত্র, আলমনগর, আমদাবাদ, যশোর

২০. আলামিন হোসেন (২৭), বেসরকারি চাকরিজীবী, আফরা, চৌগাছা

২১. সাকি (১৮), (পেশা উল্লেখ নেই), শঙ্করপুর, যশোর

২২. রিযাদ শেখ (১৮), (পেশা উল্লেখ নেই), চাঁচড়া রায়পাড়া, নিউ রামকৃষ্ণ রোড, যশোর

২৩. ফিরোজ আহমেদ (৩৪), (পেশা উল্লেখ নেই), বালিয়াপুকুর, ঘোড়ামারা, বোয়ালিয়া, রাজশাহী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)