কাজী আশরাফুল আজাদ
, যশোর
যশোরের হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আটকে পড়াদের উদ্ধারে গিয়েছিলেন দুই ভাই রিয়াদ শেখ ও হৃদয় শেখ। কিন্তু বড় ভাই হৃদয় শেখ আহত অবস্থায় বের হতে পারলেও আগুনে আটকে পড়ে নিহত হন ছোট ভাই রিয়াদ শেখ (১৮)। তিনজনকে উদ্ধারও করেছিলেন রিয়াদ। কিন্তু আকস্মিক গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের তীব্রতা এতোটাই ছড়িয়ে পড়ে যে রিয়াদ ও তার সহযোগিরা বের হতে পারেনি। ওই হোটেলের ভেতরে আগুনে পুড়ে মারা যায় রিয়াদ।
এই তথ্য সংশ্লিষ্ট পরিবারটির।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যশোরের হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুনে পুড়ে যারা মারা যান তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ১৮ বছরের যুবক রিয়াদ শেখ। শহরের চাঁচড়া রায়পাড়ায় তাদের বাড়ি।
কাবিল শেখ ও শাহিনুর বেগমের দুই ছেলে। বড় ছেলে হৃদয় প্রাইভেটকার চালক আর ছোট ছেলে ছিলেন রিয়াদ। তিনি যশোর সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পাঁচটি পরীক্ষাও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
রিয়াদের মা শাহিনুর বেগম বলেন, “রিয়াদের স্বপ্ন ছিলো লেখাপড়া শিখে পুলিশ হওয়ার। প্রায় বলতো পুলিশে চাকরি পেলে আমাদের আর কোনো অভাব থাকবে না। ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে প্রতিদিনই মিছিলে যেতো। সেখান থেকে ছবি তুলে আমাকে দেখাতো। খারাপ কিছু আশংকার কথা জানালে বলতো, ‘হাজার হাজার মায়েরা ছেলেদের সাথে রাস্তায় নেমেছে। তুমি কোনো চিন্তা করো না। দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করবো।’’
ঘটনার দিন সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সকাল সাতটার দিকে কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় রিয়াদ। বেলা ১১টার দিকে বাড়িতে ফেরে। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ে। কোনো একটি ফোন পেয়ে জেগে ওঠে। সে সময় তার ভাত মাখিয়ে দিই। সেসময় টেলিভিশনে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে দ্রুত বের হয়। বলে গিয়েছিল, বিজয় মিছিলে যাবে। বিকেলে বিজয় মিছিলে শামিল হয়েছিল মণিহার এলাকা থেকে। সেখান থেকে ফেরার পথে দেখে, হোটেল জাবিরে আগুন জ্বলছে। রিয়াদ আগুনে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে গিয়েছিলো।’
বড় ভাই হৃদয় শেখ জানান, তিনিও হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, হোটেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার করার জন্য ম্যাগপাই হোটেলের পাশ দিয়ে জাবিরের মধ্যে গিয়েছে রিয়াদসহ বেশ কয়েকজন। তারা ৩/৪ জনকে উদ্ধারও করে। কিন্তু রিয়াদ, সাকিবসহ অনেকে আটকা পড়ে যায়। তারা আর বেরতে পারেনি।”
“হোটেলে সামনে গিয়ে জানতে পারি ছোট ভাই রিয়াদসহ বেশ কয়েকজন হোটেলের মধ্যে রয়েছে। আমিও দোতলা পর্যন্ত পৌঁছাই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শুধু নিচে পানি ছিটাচ্ছিলো। তাদের কাছ থেকে আমি পাইপ নিই। এরপর ভেতরে ঢুকে পানি দিতে থাকি। পাইপ নিয়ে তিনতলায় উঠার মুহূর্তে বিকট শব্দে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একটি লম্বা সরু কাচের টুকরো আমার ডান পায়ে বিদ্ধ হয়। সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আমাকে দ্রুত নামিয়ে নিয়ে আসে এবং হাসপাতালে ভর্তি করে,’’ বলছিলেন হৃদয় শেখ।
হৃদয় জানান, তিনি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার বাবা ও মা হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন ছোট ভাই রিয়াদের লাশ মর্গে পড়ে আছে। এরপর বাবাসহ পরিবারের লোকজন মর্গে গিয়ে রিয়াদের লাশ দেখতে পান।
হৃদয় শেখ আক্ষেপ করে বলেন, ‘মৃত্যুর দুই বছর পার হলেও শহীদের মর্যাদা পায়নি নিহতরা। একটি পক্ষ হোটেল জাবিরে নিহতদের নিয়ে নানা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে।
তিনি যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, যারা মারা গেছে বা যাদের মরদেহ হোটেলের ভেতরে পাওয়া গেছে, তাদের কাছে কিছুই ছিলো না। অথচ তাদের ‘চোর’ অপবাদ সইতে হচ্ছে। সরকারির বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা বিষয়টি তদন্ত করছে। কিন্তু এখনো গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। একটি ঘটনা হাজার হাজার হাজার মানুষের সামনে ঘটলো। কারা চুরি করতে গিয়েছিলো আর উদ্ধার করতে গিয়েছিল সেটা বের করা কঠিন না। অহেতুক দেরি করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমি নিজেও গিয়েছিলাম সেখানে। আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে, আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হয়েছি। আমি কি চুরি করতে গিয়েছিলাম ?’
রিয়াদের মা শাহিনুরের দাবি যত দ্রুত সম্ভব গেজেট প্রকাশ করে নিহতদের শহীদের মর্যাদা দেওয়া হোক।
সুবর্ণভূমির এক প্রশ্নে এই নারী বলেন, তাদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ টাকা ও যশোর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে টি-শার্ট, গেঞ্জি, ক্যাপ, শ্রদ্ধাকার্ড, উত্তরীয়, শোপিচ দেওয়া হয়েছে। আর জুলাই জাদুঘর কর্তৃপক্ষ রিয়াদের একটি গেঞ্জি ও ঘড়ি নিয়ে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ফের তদন্ত করে রিয়াদকে জুলাইযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।