জলে গেছে ২৭৯ কোটি টাকা
৫৪ সেতু-কালভার্টে থমকে জোয়ার-ভাটা
শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
ভৈরব নদ পুনরুদ্ধারে ২৭৯ কোটি টাকার খনন প্রকল্প শেষ হয়েছে তিন বছর হলো। কিন্তু এখনো ফেরেনি প্রত্যাশিত জোয়ার ভাটা। নিয়মিত নৌ চলাচলও চালু হয়নি। নদের বড় অংশ ভর্তি কচুরিপানা আর বর্জ্যে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, নদের ওপর বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পনার ঘাটতি, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়হীনতা, দখল ও দূষণের কারণে শত শত কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল মিলছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভৈরব নদ পুনরুদ্ধারে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ২০১৬ সালে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। পরে সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় পৌঁছায়। ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি চৌগাছার তাহেরপুর থেকে অভয়নগরের আফরাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার নদ খননের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে তাহেরপুর থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার পুনর্খনন এবং বসুন্দিয়া থেকে আফরাঘাট পর্যন্ত চার কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়। শহরের ভৈরব তীরে সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় করা হয় সাত কোটি ৮০ লাখ টাকা।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল, নদে জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে আনা, নৌ চলাচল চালু, জলাবদ্ধতা কমানো এবং নাব্য ফিরিয়ে আনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ভৈরব নদের ওপর বর্তমানে ৫৪টি অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট রয়েছে। এর মধ্যে এলজিইডির ২৬টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের ১৯টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের চারটি, বিএডিসির তিনটি, রেলওয়ের একটি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একটি। এসব স্থাপনার বেশির ভাগের দৈর্ঘ্য মাত্র ১৬ দশমিক ৪ ফুট থেকে ১২০ ফুট। অথচ, নদের প্রস্থ বিভিন্ন স্থানে ১৫০ থেকে ২৫০ ফুট। ফলে, পানিপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে জোয়ার-ভাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে থেকেই এসব সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্টের বিষয়টি চিহ্নিত ছিল। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সেতু পুনর্নির্মাণের জন্য চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো অধিকাংশ স্থাপনা অপরিবর্তিত রয়েছে।
যশোর সদরের নূরপুর এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, তিন-চার বছর আগে নদ খনন হয়েছে। কিন্তু জোয়ার-ভাটা হয় না, পানি নামেও না। ছোট ছোট কালভার্টের কারণে নদ কচুরিপানা ও ময়লায় ভরে গেছে। এখানে একটি নতুন সেতু হওয়ার কথা ছিল, সেটিও হয়নি।
ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য তসলিম উর রহমান বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের পর নদ খনন হলেও উজানের নদী সংযোগ এখনো করা হয়নি। অপসারণ করা হয়নি খননের সময় চিহ্নিত ৫৪টি সংকীর্ণ সেতুও। নদী আইন অনুসরণ না করে কয়েকটি নতুন সেতুও নির্মাণ হয়েছে। ফলে, নদের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসেনি।
ভৈরব বাঁচাও আন্দোলনের নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, ২৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পের পরও নদের তলদেশের অনেক অংশ উঁচু রয়ে গেছে। উজানে মাথাভাঙ্গার সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হয়নি। খননের পর ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণও হয়নি। ফলে, প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান বলেন, নদী দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে শুধু খননে কোনো লাভ নেই। ভৈরব যশোরের পরিচয়ের অংশ। নদ রক্ষায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
পাঁচ নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ভৈরব, কপোতাক্ষ, মুক্তেশ্বরী ও চিত্রাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। নদীগুলোর মধ্যে সংযোগ এবং উজানের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না হলে কোনো খনন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন যশোরের সদস্যসচিব আবু সাঈদ বলেন, দখল ও দূষণ বন্ধ না করে শুধু খনন করলে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। নদী রক্ষায় আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নদ খনন হলেও জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত বাধা অপসারণ করা হয়নি। নদের ওপর ৫৪টি সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্ট বহাল। উজানের সঙ্গে সংযোগও নিশ্চিত হয়নিপানি সংগ্রাম কমিটির নেতা গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, ভৈরব শুধু একটি নদ নয়। এটি যশোর অঞ্চলের ইতিহাস, অর্থনীতি ও পরিবেশের অংশ। বর্তমানে স্থির পানি, কচুরিপানা ও দূষণ উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবকেই সামনে এনেছে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, নদ সঠিকভাবেই খনন হয়েছে। কিন্তু নদের ওপর নির্মিত অপরিকল্পিত ব্রিজ ও কালভার্টের কারণে আবারও ভরাট হচ্ছে এবং জোয়ার-ভাটা ব্যাহত হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বারবার তাগাদা দিয়েছি। সবচেয়ে বেশি স্থাপনা এলজিইডির। দ্রুত এসব স্থাপনা অপসারণ বা পুনর্র্নিমাণ করা না হলে দড়াটানা থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত প্রায় ৫৭ কিলোমিটার নদ কার্যকারিতা হারাবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট পুনর্র্নিমাণের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, নদের ওপর শুধু এলজিইডি নয়, সড়ক ও জনপথসহ বিভিন্ন সংস্থার অবকাঠামো রয়েছে। বসুন্দিয়া সেতু পুনর্র্নিমাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আরও তিনটি সেতু নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি অন্যান্য সেতুর নতুন নকশা তৈরির জন্য জরিপ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ভৈরব নদের ওপর কয়েকটি সেতু সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলছে। তিনটি সেতুর জন্য নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। দু’টি সেতুর প্রকল্প প্রস্তাব এবং একটি সেতুর নকশা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।