সুবর্ণভূমি ডেস্ক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া ভার্চুয়াল বক্তব্যের অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হিসেবে সাতক্ষীরার তরুণ আবু ওবাইদাহ অরিনের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আসার পর আলোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) অনুষ্ঠানের ভিডিও ও স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে অরিনের সাতক্ষীরার ঠিকানা ও পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তবে অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ছয় মিনিটের একটি ভিডিওতে অরিনকে ইংরেজিতে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। এতে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের শুরু হওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর অরিন প্রায় ছয় মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন এবং তরুণদের শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেন।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি সেটিকে ‘জুলাই-আগস্ট সন্ত্রাস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পুলিশের ওপর হামলা ও নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ৫ আগস্টকে পুলিশের জন্য উৎসর্গ করার কথাও বলেন। বক্তব্যে পুলিশের নিহতের সংখ্যা ‘৩ হাজার ২০০-এর বেশি’ দাবি করা হলেও এর পক্ষে প্রতিবেদকের হাতে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই সংখ্যাটি তার বক্তব্যের দাবি হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে এটিকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেন অরিন। আরসা, আরএসএ ও আরএসও নামের বিভিন্ন সংগঠনকে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে ‘৩৬ জনের বেশি সন্ত্রাসী’ যাওয়ার দাবিও করেন তিনি। তবে এসব দাবির সমর্থনে অনুষ্ঠানে কোনো তথ্য বা নথি উপস্থাপন করতে দেখা যায়নি।
বক্তব্যের শেষদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে অরিন বলেন, তিনি দেশে ফিরলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তার পাশে দাঁড়াবেন। ১৭ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় দেশরত্না শেখ হাসিনা’ স্লোগানে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫ বছর বয়সী অরিন সাতক্ষীরা সদর থানার পাশের মুনজিতপুর নিচুতলা এলাকার বাসিন্দা। তিনি জাহান প্রেসের মালিক আবু সোয়েব এবেলের বড় ছেলে। লেখাপড়ার জন্য অরিন ভারতে থাকেন বলেও স্থানীয়রা জানান।
অরিনের বাড়িতে গিয়ে মূল ফটক বন্ধ পাওয়া যায়। তার বাবা আবু সোয়েব এবেলের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় অরিনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অরিনের প্রতিবেশী ও স্থানীয় মুদি দোকানি শাহজাহান বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে শেষবার তিনি অরিনকে দেখেছেন। এরপর আর দেখেননি। তিনি ভারতে পড়াশোনা করেন বলেও শুনেছেন বলে জানান।
স্থানীয় আরেক দোকানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনুষ্ঠানের ছবি দেখে অরিনকে শনাক্ত করেন বলে দাবি করেন।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সঙ্গে অরিনের ঘনিষ্ঠতার আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আইনজীবী সৈয়দ ইফতেখার আলীর পরিবারের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানে সাতক্ষীরার কোনো বাসিন্দা উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন, এ বিষয়ে তারা অবগত নন। সদর থানার ওসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। পরে ওসি মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অরিন কীভাবে ওই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে যুক্ত হলেন, কার মাধ্যমে সেখানে অংশ নিলেন, বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন এবং আয়োজকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।