সম্পাদকীয়
যশোর বোর্ডের এসএসসি ফলাফলের ক্রমাবনতি
শিক্ষার মান ও মূল্যায়নের সততা রক্ষায় যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক এসএসসি ফলাফল এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। ২০২৪ সালে ৯২.৩২ শতাংশ পাসের হার থেকে ২০২৬ সালে তা নেমে ৬৬.২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি নিছক একটি পরিসংখ্যানগত পতন নয়, বরং একটি শিক্ষানীতি পরিবর্তনের প্রতিফলন।
আওয়ামী লীগ আমলে ‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি শিক্ষার গুণগত মান ধ্বংস করেছিল। পরীক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা ছিল ‘শিক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দিতে হবে’। এই শিক্ষাবিধ্বংসী নীতি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলকে কার্যত অর্থহীন করে তুলেছিল। অন্তর্বর্তীকালীন ও বিএনপি সরকারের অধীনে সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার অবসান ঘটেছে।
যশোর বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন, এখন শিক্ষার্থীরা যতটুকু নম্বর পাওয়ার যোগ্য, ততটুকুই দেওয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মকর্তার প্রতিধ্বনি করছেন বিগত সরকারের আমলের পরীক্ষকরা। তবে তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়।
ফলাফলের পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, আগের নীতি কতটা অসার ছিল। দেশে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়ছে- এটা প্রদর্শন করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া যায়, কিন্তু তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও নিহিত ছিল এর মধ্যে। যশোর শহরের এক শিক্ষক যথার্থই বলেছেন, ‘এখনকার ফলাফলই আসল চিত্রের প্রকাশ। এর আগের দেড় দশকে যা হয়েছে, তা ফলাফলের নামে প্রহসন।’
যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী এসএসসির ফলাফল প্রকাশের সময় যে কথাগুলো বলেছেন, তার সারবস্তু হলো, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগী করে তুলেছে। ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা রয়েছে। এই দুটি মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা সামগ্রিক ফলকে প্রভাবিত করছে। এবং আওয়ামী সরকারের সময় কৃত্রিম মূল্যায়নের ফলে পরিশ্রম ছাড়াই উত্তীর্ণ হওয়া যায়- এমন বিশ্বাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল পরীক্ষার্থীরা।
বোর্ড কর্মকর্তাদের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা আবার পড়ার টেবিলে ফিরছে, অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ছে। বাস্তব মূল্যায়ন শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে যে, প্রকৃত যোগ্যতা অর্জন ছাড়া সাফল্য সম্ভব নয়। এই ধারা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। আজকের তরুণই আগামীর ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক কারণে আমরা দেশের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করতে পারি না।
এমতাবস্থায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে পারেন। আমাদের সুপারিশ হলো, ইংরেজি ও গণিতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে। ঝরে পড়া ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা কর্মসূচি চালু করা। ডিজিটাল আসক্তি মোকাবিলায় অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় বাড়ানো। অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীবিশিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর কার্যকারিতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ভারসাম্য রক্ষা করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়ার মান পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, উদ্যোগ ও সমন্বিত প্রচেষ্টা।
আমরা মনে করি, যশোর বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ক্রমাগত পতন আপাতদৃষ্টিতে নেতিবাচক মনে হলেও এর মধ্যে সুদূরপ্রসারী কল্যাণ নিহিত রয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত মান সমুন্নত করতে প্রয়োজনীয় যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার তা নিতে হবে। সার্টিফিকেট মূল্যবান হয় তখনই যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে ওঠেন। ধারণা করা যেতে পারে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে সার্টিফিকেট কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়বে। সেই স্থান দখল করবে ব্যক্তির যোগ্যতা। সম্ভাব্য সেই বাস্তবতায় তরুণদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অবশ্যই বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন হবে; যার শুরুটা হোক এখনই।