মো. মিজানুর রহমান
প্রকাশ্য পাপ এবং গোপন পাপের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। প্রকাশ্য পাপ মানুষকে পাপকর্মে প্ররোচিত করে। গোপন পাপ তা করে না। পাপ আর অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। পাপ হচ্ছে ধর্মে নির্ধারিত রীতির লঙ্ঘন। অন্যায় হচ্ছে মানবতার লঙ্ঘন। পাপ ও অন্যায়ের মিলটা হচ্ছে ধর্মে মানবতাবিরোধী সকল কাজকে পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাপের প্রচার অপরাধী/পাপীকে প্ররোচিত করে। অপরাধের গল্প অপরাধ বিস্তার করে।
আমরা একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের মধ্যকার একটি অংশ মানসিকভাবে অনেক জটিলতায় বা অস্থিরতায় ভুগছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সামাজিক ও পারিবারিক জীবন অস্থির করে তোলে। তবে এই পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিষয়ক ঘটনাসমূহকে একদল মানুষ অতিরঞ্জিতরূপে উপস্থাপন করছে। আমরা সাধারণেরাও এখন সাধারণ দুর্ঘটনাকে আমলে নিই না বা সতর্ক হই না। কারণ এখন সাধারণ দুর্ঘটনা গা সওয়া লাগে। ফেসবুক, ইউটিউব এবং রিলস যেভাবে বিভিন্ন দুর্ঘটনা, হত্যা এবং আত্মহত্যার বর্ণনা করছে তাতে গা শিউরে ওঠার মতো। তবে গা কিন্তু বারবার শিউরে উঠে না। বরং সয়ে যায়। এখন সিনেমা, টিভি, ইউটিউব, টিকটক, রিলস সবকিছুতেই থ্রিলার টাইপ বিষয় এনে আমাদের রুচির স্তর থ্রিলার টাইপ বানানো হচ্ছে। এমনকি গল্প-উপন্যাসেও থ্রিলিং ফিলিংস চাই-ই। দুর্ঘটনা হলে হবে না, বীভৎস দুর্ঘটনা যেন আমাদের চাওয়া। সাধারণ প্রেমে আমাদের হচ্ছে না, প্রেমিকাকে না পেয়ে প্রেমিকার বাবাকে খুন। সাধারণ বিচ্ছেদে হচ্ছে না, বিচ্ছেদ শেষে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে খুনও করে ফেলছে। এরপর কতটা গভীর ষড়যন্ত্র করে খুন করা হলো সেটা নিয়ে একটি
থ্রিলার কন্টেন্ট। যার শিরোনাম-
১. জুলেখা যেভাবে জুয়াড়ি জয়নালের হাতে প্রাণ দিলো;
২. জয়নালের জালে জড়িয়ে জুলেখারা যেভাবে প্রাণ হারায়;
৩. সুন্দরী সালেকার হাতে সতীন খুন;
৪. প্রেমের টানে টাঙ্গুয়ার টিটো টাঙ্গাইলের টয়ার বাড়িতে এসে খুন;
৫. অর্থের অভাবেই অতুলের যত নৃশংস অপরাধ...
অর্থাৎ অভাব, প্রেম, বিরহ, বিবাহ এবং বিচ্ছেদের মতো ঘটনাগুলিও থ্রিলিং ফিলিংসের ক্লাইমেক্সে পৌঁছে গেছে কন্টেন্টের বা সংবাদের শিরোনামেই।
এখন অধিকাংশের হাতে স্মার্টফোন। পৃথিবী হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কী হচ্ছে তার সব খবর ঘটনা ঘটার ঠিক আগমুহূর্তে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে লাইভে এসে- ‘যার জন্য এই জনজমায়েত আর কিছুক্ষণের মধ্যেই...’। কথার বাকি অংশ আর শোনার প্রয়োজন নেই । লাইভে দেখা যাচ্ছে মারতে মারতে একজন মুরুব্বি/কিশোর/যুবক অথবা নারীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একদল মানুষ। লাইভের নিচে কমেন্টের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। যারা মারছে দর্শকেরা তাদের বিচার চাচ্ছে। কেন বিচার চাচ্ছে? একটি বীভৎস ভিডিও দেখে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে লাইভ ভিডিওতে কমেন্ট করে বিচার চাচ্ছে। কমেন্টগুলি এরকম-
১. এসব দেখার কেউ নেই;
২. দেশের শাসন ব্যবস্থা নেই;
৩. এদের বিচার হওয়া উচিত;
৫. দ্রুত এদের আইনের আওয়তায় আনা হোক;
৬. নির্দয়, পাষাণ না হলে এইরকম কাজ কেউ করতে পারে?
৭. লোক/নারীটা যা করেছে ওকে এতো অল্পে ছাড়া উচিত হবে না;
৮. যা হচ্ছে ঠিকই আছে;
৯. ৭ নম্বরে কমেন্ট করা ব্যক্তিকে গালিগালাজ;
১০. ৭ নম্বরে কমেন্ট দাতা ৯ নম্বর কমেন্টের উত্তরে ওই নির্যাতিত লোক/নারীর করা বিভৎস অন্যায়ের ভিডিও শেয়ার করে। প্রশ্ন রেখে যায়, আপনি হলে কী করতেন?
তারপর থেকে ওই পোস্টে দুটা ভিডিও চলে। নির্যাতিত ব্যক্তির ওপর করা নির্যাতন ও তার করা অপরাধ/অন্যায়/পাপের কাহিনি নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাপ এবং পাপের শাস্তি উভয়ই মানুষ সাগ্রহে দেখছে, আতঙ্কিত হচ্ছে, সতর্ক হচ্ছে, ভীতু হয়ে পড়ছে, মানুষ মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে, নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে গুটিয়ে নিচ্ছে। যাদের দুর্বল হার্ট তারা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। এক কথায় মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ছে। প্রথম কয়েকটি ভিডিও দেখলে অস্থিরতায় ভুগে আস্তে আস্তে এসব দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তারপর ওই ধরনের ভিডিও আর ভিউ পাচ্ছে না। আরও বীভৎস ঘটনা খুঁজে চলেছে ভিউ ব্যবসায়ীরা।
অপরাধ প্রকাশ্যে আনতে গিয়ে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা ফ্রিল্যান্সাররা যদি অপরাধকে অতিরঞ্জিতরূপে প্রচার করেন, তা অন্যায়। মনে রাখা উচিত, অন্যায়/পাপের প্রচার অপরাধী/পাপীকে প্ররোচিত করে। আইডির রিচ বাড়াতে গিয়ে বা ভিডিওর ভিউ বাড়াতে গিয়ে নিন্মোক্ত কাজ করা উচিত নয়-
১. ভিডিও ধারণ করে তার বিকৃত প্রচার;
২. এআই ব্যবহার করে ঘটনাকে অতিরঞ্জিত রূপ দেওয়া;
৩. ভিডিওর শিরোনামে দর্শকদের কনফিউজড করা;
৪. বর্তমান দুর্ঘটনা বা অপরাধের সাথে মিল রেখে বিভিন্ন দেশের অতীত ঘটনাগুলিকে প্রচার করা;
৫. মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে আঘাত হানে এমন ভিডিও প্রচার করে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা;
৬. যে ভিডিও দেখে মানুষ অসুস্থ/অস্বস্তিবোধ করতে পারে তা প্রচার না করা।
যেসকল ভিডিও মানব মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তার উপস্থাপনাটা গুছিয়ে করতে হবে। স্মার্টফোন হাতে হাতে থাকায় এবং মানুষের নেতিবাচক বিষয়ে আগ্রহ বেশি থাকায় নেতিবাচক কন্টেন্ট দ্রুত ছড়ায়। সারাদিনে মোবাইলে আমরা প্রচুর ভিডিও দেখছি, যার বড় অংশ এরকম অন্যায় এবং অপরাধবিষয়ক। কিশোর হতে বৃদ্ধ সকলেই আমরা মানসিক অস্থিরতায় ভুগছি। আসুন আমরা সচেতন হই। আমরা অন্যায়-অপরাধ তুলে ধরতে গিয়ে যেন অপরাধের প্রচারণা না চালাই। আর ভিডিও দেখা মাত্রই আমরা তা বিশ্বাস করে যেন কারো উপর আক্রমণাত্মক হয়ে না উঠি। প্রকৃত ঘটনা না জেনে, না বুঝে ভুলভাল/উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও শেয়ার করে পাপ/অন্যায়ের প্রচার না করি।
লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা