সুবর্ণভূমি ডেস্ক
নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো সুযোগ না দিয়ে এক ভারতীয় নারীকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ আউট) অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিস জারি করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
শাহিন ফকির নামে এক যুবকের করা ‘হেবিয়াস করপাস’ রিট আবেদনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনোরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
শুনানিতে আবেদনকারীর পক্ষে অংশ নেন প্রবীণ আইনজীবী ও ওডিশা হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি শ্রীনিবাসন মুরলিধর। তার সঙ্গে ছিলেন কলকাতার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ঝুমা সেনসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী। বিচারপতি শ্রীনিবাসন মুরলিধর সম্প্রতি ফিলিস্তিন ভূখণ্ডসংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনে শিশুদের ওপর সরাসরি ও ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে।
পিটিশনে শাহিন ফকির তার মাকে ‘আটক ব্যক্তি’ বলার বদলে ‘বলপূর্বক বিতাড়িত ব্যক্তি’ বা ‘পুশ আউটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, মায়ের স্থায়ী ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গোবিন্দপুরে এবং তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক। প্রায় ২০ বছর আগে রোজগারের সন্ধানে স্বামীর সঙ্গে তিনি মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি গৃহকর্মীর কাজ করতেন।
আবেদনকারীর অভিযোগ, গত ১৯ জুলাই মুম্বাইয়ে তার মাকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়। কোনো বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির না করে বা গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে তাকে টানা ১০০ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখা হয়। দীর্ঘ এ সময়ে পরিবারকেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। প্রায় পাঁচ দিন পর তাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত এলাকা দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ে কোনো বিচারিক পদক্ষেপ বা কনস্যুলার সহায়তা নেওয়া হয়নি। এমনকি নিজের জাতীয়তার সপক্ষে যুক্তি বা প্রমাণ দাখিলের কোনো সুযোগও ওই নারীকে দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর ওই নারী সীমান্তরক্ষীদের সহায়তায় মানবিক আশ্রয় পান। পরে ৩১ জুলাই তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের অবস্থার কথা জানান। এর আগে আসামের এমন একটি ঘটনা হাইকোর্টের সমালোচনার মুখে পড়েছিল বলে পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে পেশ করা নথিতে উল্লেখ করা হয়, ওই নারীর কাছে বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকায় তার মাতামহের নাম এবং ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তার মা-বাবার নাম রয়েছে। সম্প্রতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর তার নাম বাদ পড়লে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আপিল ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করা হয় এবং তা বিচারাধীন রয়েছে।
মামলায় কেবল ওই নারীকে অবৈধভাবে বিতাড়নকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়নি, পাশাপাশি ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা ‘অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বিতাড়নসংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)’ এবং ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অর্ডার, ২০২৫’-এর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি, এই নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে গেছে, যা ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদে দেওয়া মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। এর ফলে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদেরও ভুলবশত ও বেআইনিভাবে বহিষ্কারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই পুশ আউটের প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে ওই নারীকে ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে।
আইনজীবীর যুক্তি, কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিকত্ব দাবি করলে এবং অন্য রাজ্যে তার স্থায়ী বাসস্থানের কথা উল্লেখ করলে, এসওপির নির্দেশিকা মেনে তা যাচাই করা আবশ্যক; যা এ ক্ষেত্রে মানা হয়নি। এ ছাড়া ওই নারীর কাছে কোনো বৈধ পাসপোর্ট না থাকা সত্ত্বেও নিয়ম অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
এই পুশ আউট প্রক্রিয়াকে বেআইনি ও অনৈতিক আখ্যা দিয়ে ওই নারীকে অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী।
এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিল যে সম্প্রতি জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো বেশ কয়েকজন বাঙালি মুসলমানকে মানবিক কারণে তারা দেশে ফিরিয়ে এনেছে।