তদন্তের আশ্বাস উপাচার্যের
যবিপ্রবি প্রতিনিধি
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকার পরও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ব্যানারে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এই মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়।
২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মসিয়ূর রহমান হলে সংঘটিত বহিরাগত হামলা-লুটপাট এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিচারের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি।
কর্মসূচির ব্যানারে আয়োজক হিসেবে 'জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও যবিপ্রবি পরিবার'-এর নাম উল্লেখ ছিল। এতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
তবে ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে মানববন্ধনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আগে থেকে লিখিতভাবে কেউ জানায়নি বলে প্রক্টর দপ্তর নিশ্চিত করেছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর রাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের বিভিন্ন কক্ষে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। ওই রাতে শিক্ষার্থীদের নগদ টাকা, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়েছিল। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো বিচার না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ছয় দফা দাবি উত্থাপন
মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো:
১. হল ডাকাতির ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যাদের ছাত্রত্ব ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে তাদের সনদ বাতিল এবং যাদের শিক্ষাজীবন চলমান তাদের ছাত্রত্ব স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে।
২. উক্ত ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পূর্বে দায়ের করা ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ঘটনার রাতে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে ক্ষতিপূরণের নামে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তারও তদন্ত করতে হবে।
৪. ঘটনার রাতে তৎকালীন হল প্রশাসন, প্রক্টর ও ছাত্র পরামর্শ দপ্তরের কোনো অবহেলা বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে খতিয়ে দেখতে হবে।
৫. ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এত বছরেও কেন প্রকাশ করা হয়নি, তা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. শহীদ মশিউর রহমান হলে বিগত সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যান্য অপরাধের উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। (এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১৭ জন চাকরিপ্রার্থীকে অপহরণ করে আটকে রাখার অভিযোগে হলটির তৎকালীন প্রভোস্টের বিরুদ্ধে ওঠা সংশ্লিষ্টতার তদন্ত এবং হলের সিসিটিভি ফুটেজের হার্ডডিস্ক গায়েব করার ঘটনার বিচার নিশ্চিতের দাবিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে)।
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. হারুন রশীদ বলেন, ‘আজকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করবেন—বিষয়টি বেলা ১১টার দিকে ছাত্রদলের সালেক খান আমাকে ফোনে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা যে ছাত্রদলের ব্যানারে এই কর্মসূচি করবেন, সেটি আমাদের জানানো হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, ‘রিজেন্ট বোর্ডের আইন অনুযায়ী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যে কেউই দলীয় ব্যানারে রাজনৈতিক চর্চা করতে চাইলে তা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর আমি সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়েছি। তাদের বলেছি, দলীয় ব্যানার ব্যবহার না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেবার মান ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে।’
উল্লেখ্য, যবিপ্রবির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম রিজেন্ট বোর্ডের ১০৩তম জরুরি সাধারণ সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সব প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। উক্ত আইন অমান্য করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।