রূপক মুখার্জি
, লোহাগড়া (নড়াইল)
পহেলা বৈশাখের এক চিরায়ত প্রতীক ‘হালখাতা’। একসময় বাংলা নববর্ষ অনুষ্ঠানের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল হালখাতা। হালখাতা, যার লাল মলাটের ভাঁজে ভাঁজে জমা থাকত দেনা-পাওনার হিসাব। আর এই দেনা-পাওনার হিসাবকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের সাথে ক্রেতাদের সম্পর্কের এক পরম উষ্ণতা সৃষ্টি হলো হালখাতা উৎসব। এক কথায়, হালখাতা হল একটি আর্থ-সামাজিক লোকজ উৎসব।
হালখাতার উৎস : ফারসি ‘হাল’ অর্থ নতুন, আর ‘খাতা’ অর্থ হিসাবের বই। অর্থাৎ, পুরনো বছরের সব হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের প্রথমদিনে নতুন খাতা খোলার মধ্য দিয়েই শুরু হতো ব্যবসার নতুন যাত্রা।
লালসালুতে মোড়ানো সেই খাতার প্রতিটি পাতায় থাকতো সুসংগঠিত হিসাব—বাম পাশে জমা, ডান পাশে খরচ। এই প্রথার শিকড় খুঁজতে গেলে যেতে হয় মোগল আমলে। সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন মূলত খাজনা আদায়কে সুশৃঙ্খল করতে। সেই সময় জমিদারদের খাজনা আদায়ের একটি বিশেষ আয়োজন ছিল ‘পুণ্যাহ’। বছরের প্রথম দিনে প্রজারা জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা দিতেন, আর বিনিময়ে পেতেন মিষ্টিমুখের আপ্যায়ন। এই ‘পুণ্যাহ’ থেকেই ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক হালখাতার ধারণা বিস্তার লাভ করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, ‘পুণ্যাহ’ হারিয়ে গেছে ইতিহাসের কালচক্রে। কিন্তু হালখাতা টিকে আছে নিজস্ব রূপে।
একসময় দোকানিরা নববর্ষ উপলক্ষে নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে ক্রেতাদের দাওয়াত দিতেন। দোকান সাজানো হতো ফুল ও রঙিন কাগজে, আর আগত অতিথিদের মিষ্টি, পান কিংবা শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। শুধু হিসাব মেটানো নয়, এটি ছিল সম্পর্ক নবায়ণের এক উৎসব।
হালখাতার দিনে মুসলিম ব্যবসায়ীরা নতুন খাতার প্রথম পাতায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ লিখে দোয়া-মিলাদের আয়োজন করতেন, আর হিন্দু ব্যবসায়ীরা গণেশ ও লক্ষ্মীর পূজার মাধ্যমে শুরু করতেন নতুন হিসাব। ভিন্ন আচার, কিন্তু লক্ষ্য এক। নতুন বছরে সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা।
সময় বদলেছে। ডিজিটাল যুগে কম্পিউটার, মোবাইল অ্যাপ, বিকাশ-নগদের মতো অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থার কারণে কাগজের খাতার ব্যবহার কমেছে। তারপরও পরিবর্তিত সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আজও টিকে আছে হালখাতা উৎসব। দেশের অনেক এলাকায় হালখাতা এখন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা, কোথাও বা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার পথে।
নবগঙ্গা নদীর উত্তরপাড়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী লোহাগড়া বাজারের ‘হালখাতা উৎসব’ আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা আজও হালখাতার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। ব্যবসায়ীরা নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে পহেলা বৈশাখের আগেই তা পাওনাদারদের কাছে পৌঁছে দেন। আর নববর্ষের দিন মিষ্টি মুখের মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ী ও পাওনাদারদের মধ্যে বিশ্বাস, আন্তরিকতার এক পুনর্মিলনী হলো হালখাতা উৎসব।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই লোহাগড়া বাজারের হালখাতা উৎসবে শত শত ক্রেতা সাধারণের আগমনে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিশেষ করে স্বর্ণপট্টিতে পুরুষ মানুষের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
জননী জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী বিকাশ কর্মকার বলেন, ‘লোহাগড়ার হালখাতা উৎসব অতি প্রাচীন। আমরা বংশ পরম্পরায় এ উৎসব পালন করে আসছি। এতে মানুষে মানুষে উষ্ণ সম্প্রীতির বন্ধনের সৃষ্টি হয়।’
আপন জুয়েলার্সের মালিক বিশিষ্ট স্বর্ণ ব্যবসায়ী নির্মল পোদ্দার কালু বলেন, ব্যবসায়িক রীতিনীতি মেনে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও হালখাতা উৎসব পালিত হচ্ছে। হালখাতা উৎসব বাংলা ও বাঙালির প্রাণের উৎসব।
লোহাগড়া বাজারের স্বর্ণপট্টিতে হালখাতা উৎসবের শামিল হন সাংবাদিক কাজী ইমরান। তিনি বলেন, ঐতিহ্য আর লোকজ সংস্কৃতির অংশ হালখাতা।
আসলে হালখাতা শুধু একটি ব্যবসায়িক রীতি নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অনন্য প্রতিফলন। এখানে অর্থের লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, আন্তরিকতা আর সম্পর্কের পুনর্গঠন। আধুনিকতার ঢেউয়ে এর রূপ বদলালেও, হালখাতার মূল চেতনা এখনো একই। পুরনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করা।