আনোয়ার হোসেন
, মণিরামপুর (যশোর)
যশোরের মণিরামপুরে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান ভেঙে পড়েছে। একসময় রোগীদের উপস্থিতিতে উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো মুখরিত থাকতো। কিন্তু ওষুধ সংকটের কারণে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর দেখা মেলে না বললেই চলে। দু’-একজন সেবা নিতে এলে তাদের মৌখিক পরামর্শ নিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
গত দুই-তিন মাস ধরে উপজেলার ৪৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবার চিত্র এমনই।
দীর্ঘ আট মাস ধরে উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় সংকট তীব্র আকারে ধারণ করেছে। ফলে, সেবা বঞ্চিত হচ্ছে এই জনপদের লক্ষাধিক মানুষ। একসময় বাড়ির পাশে হাত বাড়ালেই যেখানে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মিলতো, এখন রোগীদের মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রমতে, চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই উপজেলায় ৪৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে ওঠে। এখানে আগত রোগীরা স্বাস্থ্য পরামর্শের পাশাপাশি জ্বর, আমাশয়, গ্যাস, ব্যথা, সর্দি, কাঁশি, চুলকানি, দাউদ, এলার্জি, ক্যালশিয়াম, আইরন, জিংক, বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট, ডায়বেটিস ও প্রেশারসহ নানা রোগের ২২ প্রকারের ওষুধ পেতেন।
প্রতি তিন মাস পর ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ হতো। স্থানীয়দের চাহিদার উপর ভিত্তি করে ক্লিনিক প্রতি দুই-তিন কার্টন ওষুধ সরবরাহ করা হয়। গত বছরের আগস্টের পর হঠাৎ করে ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় ৮ মাস কোনো ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, প্রতিমাসে গড়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ৩৬-৩৭ হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতো। ওষুধ না থাকায় তা কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। এখন এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগতদের শুধু মৌখিক পরামর্শ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
উপজেলার একাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, সর্বশেষ গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যে ওষুধ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে, তার বেশিরভাগ ওষুধ শেষ হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। এরপর থেকে ক্লিনিকে সেবা নিতে এসে রোগীরা নামমাত্র দুই এক পদের ওষুধ পেতেন। চলতি মাসে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো একেবারে ওষুধ শূন্য হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রোহিতা কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে কথা হয় সেখানকার কমিউনিটি হেল্থ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) দেবব্রত সরকারের সাথে। তিনি বলেন, গত বছরের ২৬ আগস্ট তিন কার্টন ওষুধ পেয়েছি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সব ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। কিছু কৃমিনাশক বড়ি ছিল। তাও শেষ হয়েছে চলতি মাসের সাত তারিখে। এখন টোটালি কোনো ওষুধ নেই। ক্লিনিক খুলে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
কথা হয় ওই ক্লিনিকে ওষুধ নিতে আসা কিশোর শাওনের (১৫) সাথে। সে জানায়, কয়েকমাস আগে এসে এখানে ওষুধ পায়। চুলকানির ওষুধ নিতে এসেছিল। তারা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বাসুদেবপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মিতা দত্ত বলেন, এখানে গর্ভবতী নারী বেশি আসেন। সর্বশেষ কিছু আয়রন ট্যাবলেট ছিল, তা রোগীদের দিচ্ছিলাম। একমাস ধরে তাও দিতে পারছি না।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত ১৮ জন রোগী এসেছেন। চেকআপে আর পরামর্শ দিয়ে তাদের বিদায় দিয়েছি- বলেন তিনি।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে কয়েকমাস ওষুধ সরবরাহ নেই। আমরা নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাচ্ছি। কবে, ওষুধ আসবে তারা সেটা জানাতে পারছেন না। শুধু এতটুকু বলছেন, ওষুধ এলে পাবেন।’