যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বর্ষবরণ: বর্জ্যের স্তূপ শহর যশোরের অনুষ্ঠানস্থলে

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ১৫ এপ্রিল,২০২৬, ১১:০২ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল,২০২৬, ১২:০৭ এ এম
বর্ষবরণ: বর্জ্যের স্তূপ শহর যশোরের অনুষ্ঠানস্থলে

বরাবরের মতো এবারও যশোরে সাড়ম্বরে উদযাপিত হলো বাংলা নববর্ষ। বর্ণিল এই আয়োজনের পর উৎসবস্থল ও শহরের মূল অংশজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র পৌরপার্কে মানুষের ঢল নামে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পান্তা, বৈশাখী পোশাক, মুখোশ, ঢাকের বাদ্য আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় দিনভর উৎসবের আবহ ছিল শহর যশোরজুড়ে। সন্ধ্যার পরও ছিল উৎসবের আমেজ। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সন্ধ্যার পরের অনুষ্ঠানগুলো হয় ইনডোরে।

এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাগত দুর্বলতার কারণে এমনটি হয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভাষায়, এমন বিশৃঙ্খল শোভাযাত্রা যশোরে আগে কখনো দেখা যায়নি। শোভাযাত্রার নির্ধারিত রুট নিয়ে বিভ্রান্তি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা- সব মিলিয়ে পুরো আয়োজনেই দেখা যায় সমন্বয়ের ঘাটতি।

উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর সুশৃঙ্খলভাবে শোভাযাত্রা করি। কিন্তু এবার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না। হঠাৎ করেই যানবাহন ঢুকে পড়ছে, কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই- এটা অত্যন্ত হতাশাজনক।’

বিবর্তন যশোরের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা প্রতিবছরই জেলা প্রশাসনের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং এ আয়োজনকে ঘিরে আগেভাগেই একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টাউনহল মাঠে সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন একত্রিত হওয়ার পর পশ্চিম গেট দিয়ে শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা ছিল।’

‘পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষ করে চারুপীঠ যশোর ও এসএম সুলতান ফাইন আর্টস কলেজসহ বিভিন্ন সংগঠনের তৈরি বড় বড় মোটিফ টাউন হল মাঠে প্রবেশ করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু গেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সেসব বৃহৎ মোটিফ মাঠে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে সেগুলো পশ্চিম গেটের বাইরে রাখা হয়।’

তিনি অভিযোগ করেন, এমন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রশাসন হঠাৎ করে পূর্ব পাশের গেট দিয়ে শোভাযাত্রা বের করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পুরো আয়োজনের ছন্দ নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘ দুই মাস ধরে শিল্পী ও সংগঠনগুলোর যে শ্রম, সৃজনশীলতা ও পরিকল্পনা ছিল, তা মুহূর্তেই ভেস্তে যায়।

তার ভাষায়, এবারের বৈশাখে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শোভাযাত্রা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করেন।

চারুপীঠের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ বলেন, সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এবারের শোভাযাত্রা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল ও হতাশাজনক আয়োজন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, যেখানে যশোরের বৈশাখ মানেই ছিল শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতা, সেখানে এবারের আয়োজন সেই ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পৌরপার্কের বেহাল অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরো বলেন, পৌরপার্ক কোনো বাণিজ্যিক এলাকা নয়; এটি এই ইট-পাথরের শহরের মাঝে মানুষের জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গা। কিন্তু এখন সেখানে পচা দুর্গন্ধে মানুষ বসতেই পারছে না। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা পুরো পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে।

তিনি সরাসরি পৌরসভার উদাসীনতাকে দায়ী করে বলেন, যদি পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন করা হতো, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো এবং মানুষকে সচেতন করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এটি স্পষ্টভাবে পৌরসভার পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।

দিনভর উৎসব শেষে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত যখন শহর আনন্দে মুখর ছিল, তখন কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ভোর হতেই যেন এক ভিন্ন যশোরের দেখা মেলে। সরেজমিনে দুপুর ২টা পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায় শহরের বিভিন্ন স্থান, বিশেষ করে পৌরপার্ক ও আশপাশ এলাকা পরিণত হয়েছে এক বিশাল খোলা ডাস্টবিনে।

চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ব্যবহৃত টিস্যু, প্লাস্টিকের বোতল, থালা-বাসন, গ্লাস, খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও কোথাও জমে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট থেকে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। বৈশাখের দাবদাহে সেই দুর্গন্ধ আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

অনেক মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকালে হাঁটতে এসে মনে হয়েছে যেন কোন ডাস্টবিনে ঢুকেছেন। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উৎসবের নামে শহরকে নোংরা করে ফেলা হয়েছে।

কামাল হোসেন নামে এক নাগরিক বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন এখানে হাঁটতে আসি। কিন্তু আজকের পরিবেশে দাঁড়ানোই কঠিন। শিশুদের নিয়ে আসা তো দূরের কথা, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাক্তার নাজমুস সাদিক রাসেলের মতে, এ ধরনের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। পচনশীল বর্জ্য থেকে ছড়াতে পারে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ। বিশেষ করে গরমের সময় এই ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।

যশোর পৌরপার্ক, যা প্রতিদিন মানুষের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির জায়গা হিসেবে পরিচিত, সেই স্থানটিই পরিণত হয়েছে দুর্গন্ধ ও বর্জ্যের স্তূপে। যেখানে মানুষ ভোরে নির্মল বাতাস নিতে আসে, সন্ধ্যায় হাঁটে, পরিবার নিয়ে সময় কাটায় সেই জায়গার বর্তমান অবস্থা যেন পুরো শহরের ব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, এবছর পৌরপার্কে ৭০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ছোট স্টলের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং বড় স্টলের ভাড়া এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু জানান, বাস্তবে ৫৫ থেকে ৬০টি স্টল ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং সঠিক হিসাব জানতে হিসাব শাখায় যোগাযোগ করতে হবে।

তিনি বলেন, পৌরপার্কের ময়লা অপসারণের কাজ চলছে। তবে শহরের অন্যান্য জায়গার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন বা জেলা পরিষদের।

অন্যদিকে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন বলেন, ‘স্টল ভাড়া থেকে যে অর্থ আসে, তার চেয়ে বেশি খরচ হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়। প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’

সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, যদি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সঠিক হতো, তাহলে কেন উৎসব শেষে এমন ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হলো? স্টল থেকে আয় হওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হলো? কেন পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও তদারকি ব্যবস্থা রাখা হয়নি?

সাংস্কৃতিক কর্মী মুমিনুর রহমান তাজ বলেন, উৎসব আয়োজন মানে শুধু মঞ্চ আর গান নয়। এর সাথে জড়িত থাকে পুরো ব্যবস্থাপনা। এখানে সেই জায়গাটাতেই বড় ধরনের ব্যর্থতা হয়েছে।

একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। অনেকে যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলে রেখে গেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করেছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)