সেবার নামে পকেট কাটার মহোৎসব
সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
যশোরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে চরম অরাজকতা ও রোগীদের সাথে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। সেবার নামে সাধারণ মানুষের ‘পকেট কাটা’র মহোৎসবে মেতেছেন কিছু অসাধু ক্লিনিক মালিক।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, যশোর জেলার আট উপজেলায় মোট ৩০৯টি অনুমোদিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি ক্লিনিক ও ১৮৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যশোর শহরসহ সদর উপজেলার মধ্যে রয়েছে নামে-বেনামে ১৪৫টি প্রতিষ্ঠান। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এর মধ্যে ২৭৩টি প্রতিষ্ঠানেরই হালনাগাদ লাইসেন্স নেই। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে অসংখ্য অবৈধ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা লাইসেন্সের আবেদন করার প্রয়োজন বোধও করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই আবাসিক ভবন বা ঘিঞ্জি গলিতে অবস্থিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে যশোর জেনারেল হাসপাতাল ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, কিংস মেডিকেল সার্ভিসিং অ্যান্ড হসপিটাল, ডক্টর চেম্বার, আল হায়াত হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সিটি হসপিটাল, অথোপেডিক্স ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আলী ডেন্টাল কেয়ার অ্যান্ড অর্থডোনটিক্স, পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হসপিটাল, নোভা মেডিকেল সেন্টার হসপিটাল, ইউনিক হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আধুনিক হসপিটাল, মেডিল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার, গ্রীন লাইফ, ডাক্তার বাড়ি, প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জনতা হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আরজে ডায়াবেটিস ফুড অ্যান্ড ভাইটাল কেয়ার হাসপাতাল, আয়েশা মেমোরিয়াল সেন্টার, যশোর ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ক্লিনিকে দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকলেও বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রোগীদের আকৃষ্ট করা হয়। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনায় মাঝেমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন হলেও সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না, থেকে যায় ফাইলবন্দী। এমনকি অনিয়মের অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান কিছুদিন পর ‘বিশেষ ব্যবস্থাপনায়’ ফের চালু করে মালিক পক্ষ। প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেরই নেই কোনো হালনাগাদ লাইসেন্স, নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক বা দক্ষ নার্স। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চলছে অস্ত্রোপচারের মতো স্পর্শকাতর কাজ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেসরকারি এই সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিয়োগ করা অসংখ্য দালাল রয়েছে; যারা মূলত গ্রাম থেকে আসা রোগীদের টার্গেট করে। দালালরা উন্নত চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এসব নিম্নমানের ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে প্যাথলজিক্যাল টেস্টের নামে নেওয়া হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বেশিরভাগ ল্যাবে নেই কোনো দক্ষ টেকনোলজিস্ট। ফলে ভুল রিপোর্ট আসার অভিযোগ নিত্যদিনের। এতে ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সম্বন্ধে খোঁজ-খবর রাখেন, এমন দুই ব্যক্তি মাহফুজ হোসেন, জিয়াউল হাসান। শহরের এই দুই বাসিন্দার ভাষ্য, নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর অভিযানের অভাবে ক্লিনিক মালিকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হলেও কিছুদিন পর আবারও পুরনো চেহারায় ফিরে আসে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রায়ই রোগীদের মুখ থেকে খেদোক্তি শোনা যায়, ‘ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তার যেসব পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন, সেগুলো করতে গিয়ে তারা ফতুর হওয়ার উপক্রম হন। সরকারি হারের চেয়ে বেসরকারি ল্যাবের পরীক্ষার খরচ অনেক বেশি, যদিও তার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’
এ বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মাসুদ রানা বলেন, ‘সরকার থেকে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে অবৈধ সেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধের। আমরা অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর তালিকা তৈরি করেছি। যাদের লাইসেন্স নেই বা শর্ত পূরণ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের সাথে আপস করার কোনো সুযোগ নেই।’