বাসভবন ঘেরাও ভাঙচুর, মহাসড়ক অবরোধ
ফেসবুক লাইভে ক্ষমা প্রার্থনা, বিএনপির বিবৃতি
কাজী আশরাফুল আজাদ
, যশোর
একটি মাদরাসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষপর্যন্ত রূপ নিল প্রকাশ্য সংঘাতে। যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম রছুলের পরিবারের বিরুদ্ধে স্থানীয় একটি মাদরাসা বন্ধের ষড়যন্ত্র, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দিনভর উত্তপ্ত ছিল যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকা।
সকাল থেকে শত শত মানুষ এমপির বাসভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভে অংশ নেন। একপর্যায়ে তারা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, ডিবি ও র্যাব মোতায়েন করা হয়। উত্তেজনার মধ্যেই এমপির বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
পরে জামায়াতে ইসলামী সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণা দিয়ে তা প্রত্যাহার করে সন্ধ্যায় এ হামলার প্রতিবাদে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এরও আগে এমপি অধ্যাপক গোলাম রছুল ফেসবুক লাইভে এসে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন।
দিনভর ঘটনাপ্রবাহে উঠে এসেছে দুটি ভিন্ন চিত্র। একদিকে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও মাদরাসাসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ সংসদ সদস্যের পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল এবং এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে বারবার বিরোধ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, এমপি গোলাম রছুলের পরিবার বলছে, এটি মূলত বাড়ির সামনের রাস্তা ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ; তাদের মেয়ের মানসিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, দুইপক্ষের বিরোধ থেকেই পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং বর্তমানে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের বিরোধের বিস্ফোরণ
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের বাসভবনের সামনে রয়েছে ‘আল মাদরাসাতুশ শারইয়াহ’ এবং একটি মসজিদ। মাদরাসায় যাতায়াতের রাস্তা ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমপি পরিবারের সঙ্গে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের বিরোধ চলে আসছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমপির মেয়ে অনন্যা প্রায়ই মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের বকাঝকা করতেন। তাদের দাবি, তিনি মাদরাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতেন এবং শিক্ষার্থীদের সেখানে অবস্থান কিংবা যাতায়াত পছন্দ করতেন না। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমে উঠছিল।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, এমপিকন্যা মেহেজাবিন জান্নাত অনন্যা মাদকাসক্ত। তিনি প্রায়ই মাদক সেবন করে স্থানীয়দের সাথে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন। এর আগেও তিনি স্থানীয় কয়েকজন নারীর সাথে অসদাচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ।
এছাড়া, মাদরাসায় যাওয়ার পথে তিনি প্রায়ই শিশুদের লক্ষ্য করে গরম পানি, ডিমের খোসা ও ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয় নারীরা।
রেহেনা বেগম নামে এক নারী বলেছেন, বাড়ির ওপর থেকে মরিচের গুঁড়া ও গরম পানি নিক্ষেপ করা হয় মাদরাসার শিশুদের ওপর। অনেক সময় স্থানীয় বাসিন্দারাও আক্রান্ত হন। মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়টি বেশ কয়েকবার জানানো হয়েছে।
আঞ্জুমান হীরা নামে এক নারী জানিয়েছেন, অনন্যা প্রায়ই স্থানীয় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সাথে মারমুখী আচরণ করতেন। তিনি আগেও কয়েক শিক্ষার্থীকে চড়থাপ্পড় মেরেছেন। ঘটনার আগের দিন এক শিক্ষার্থীকে মারধরের পাশাপাশি স্থানীয় একটি মসজিদের ইমামের সাথেও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করা হয় বলে তার দাবি।
মরিয়ম বেগম নামে আরেক নারী এমপির মেয়ে অনন্যার বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে বলে কখনো কিছু বলতে পারিনি। আগেও একবার স্থানীয়রা তার পরিবারের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে। সেসময় এলাকার মুরব্বিরা মীমাংসা করে দেন।’
আজিবুর রহমান নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্যের মেয়ের এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকলেও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের ঘটনার পর আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রশাসন যদি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয় তাহলে স্থানীয়রা কঠোর পদক্ষেপ নেবে।’
আহত রেক্সোনা বেগমের ননদ অন্তু বলেন, এর আগেও অনন্যা অন্য অভিভাবকদের সাথে খারাপ আচরণ করেছেন। বাচ্চাদের রাস্তায় দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। নানা বিরক্তিকর কথাবার্তা বলেন।
আল মাদরাসাতুশ শারইয়্যাহর মুহতামিম কবির হোসাইন অভিযোগ করে বলেন, ‘এমপি সাহেবের মেয়ে শিশুদের ওপর বিভিন্ন সময় চড়াও হয়। সর্বশেষ সোমবারও মারধর করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার বসে মীমাংসা করা হয়। মঙ্গলবার সকালে শিশুরা খেলছিল; হঠাৎ এমপির মেয়ে শিশুদের ওপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে এমপি সাহেবের মেয়ে তালা ছুঁড়ে মারলে এক শিশু শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মাথায় লাগে। তারপর ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও জনতা এসে বিক্ষোভ করে।’
তিনি বলেন, এমপি এই মাদরাসা বন্ধ করে দিতে চান। তবে এই বক্তব্য খণ্ডন করে ফেসবুক লাইভে এমপি গোলাম রছুল বলেন, ‘এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় আমার অবদান আছে। ফলে মাদরাসা বন্ধের চেষ্টার অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
সোমবারের ঘটনার পর উত্তেজনা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সোমবার সকালে মাদরাসায় গিয়ে এমপির মেয়ে অনন্যা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখান। এ নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের সঙ্গে তার বিতণ্ডা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় আয়ান নামে এক শিশু শিক্ষার্থী, রেকসোনা নামে এক নারী এবং নাসির উদ্দিন নামে এক অভিভাবকের সঙ্গে তার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অনন্যা তালা দিয়ে আঘাত করে রেকসোনার মাথা ফাটিয়ে দেন এবং নাসির উদ্দিনের সাইকেল ভেঙে ফেলেন। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং স্থানীয়ভাবে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, বিরোধের আপাত সমাধান হয়েছে।
মঙ্গলবার আবারও বিরোধ
স্থানীয়দের অভিযোগ, মঙ্গলবার সকালে মাদরাসা খুলতেই অনন্যা আবার সেখানে যান এবং মাদরাসা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ পেয়ে আশপাশের এলাকার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। সকাল দশটার দিকে শত শত নারী-পুরুষ এমপির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। তারা অভিযোগ করেন, একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা ঘটনার বিচার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের সঙ্গে বিরোধ নয়; এটি এলাকার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে মাদরাসার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
ঘেরাও থেকে মহাসড়ক অবরোধ
মঙ্গলবার সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভ আরও তীব্র হতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে এমপির এক স্বজন ঘটনাস্থলে এলে বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশ তার ওপর চড়াও হয়। তাকে মারধরের অভিযোগও ওঠে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে দীর্ঘ সময় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং পুরো এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
অবরোধ চলাকালে এমপি ও তার মেয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং মাদরাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বাসভবনে হামলা-ভাঙচুর
পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিক্ষোভকারীদের একাংশ এমপি গোলাম রছুলের বাসভবনে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসভবনের সামনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সংসদ সদস্য গোলাম রছুল ও তার মেয়ে বাসভবনের মূল ফটক বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন বলে স্থানীয়রা জানান।
খবর পেয়ে যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশের পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহসান হাবীব ঘটনাস্থলে যান। র্যাব যশোর ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি প্রিন্সও ঘটনাস্থলে যান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন এবং দুইপক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেন। তবে দীর্ঘ সময় উত্তেজনা বিরাজ করায় পুরো এলাকাজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আনছারুল হক রানা ঘটনাস্থলে যান। তিনি বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা শান্ত হন, বাড়ি ফিরে যান। আমরা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করবো।’
জানতে চাইলে আনছারুল হক রানা সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী অমিতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করি। তারা প্রতিমন্ত্রীর কথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিক্ষোভ বন্ধ করে একে একে ফিরে যান। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে জামায়াতের লোকজন জড়ো হতে থাকলে পরিস্থিতি আবার উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এমপি পরিবারের দাবি- মেয়ের মানসিক সমস্যা
স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রছুলের স্ত্রী শারমিন ডিনা দাবি করেন, তাদের মেয়ে অনন্যা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং এ কারণে বিভিন্ন সময় তার আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের দীর্ঘদিনের মানসিক সমস্যা রয়েছে। ভারতের হায়দরাবাদসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে তার চিকিৎসা করানো হয়েছে। মাদরাসা বন্ধ থাকলেও অনেক সময় শিশুরা বাড়ির সামনে এসে গোলযোগ করে। আমার মেয়ে শুধু এর প্রতিবাদ করেছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে তাদের পরিবারকে পরিকল্পিতভাবে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। বিক্ষোভের সময় তাদের বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।
আহতের স্বজনের অভিযোগ
আহত রেকসোনার ননদ অন্তু অভিযোগ করেন, ‘এমপি সাহেবের মেয়ে কারণে-অকারণে মাদরাসায় গিয়ে ঝামেলা করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসাটি উঠিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন। সোমবারও তিনি লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তার হামলায় রেকসোনা আহত হন।’
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবকও অভিযোগ করেন, মাদরাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন আচরণ মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
ফেসবুক লাইভে ক্ষমা চাইলেন এমপি
দিনভর উত্তেজনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে অধ্যাপক গোলাম রছুল ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মাদরাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। তার দাবি, রাস্তার জমিটি তাদের কেনা সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। লাইভে তিনি বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য আমি মর্মাহত। এই ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ। তাকে ভারতের হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। তার আচরণকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটি অনাকাক্সিক্ষত।’
একইসঙ্গে তিনি নিরাপত্তাহীনতার কথাও উল্লেখ করেন। তার দাবি, ‘আমি ভীত ও সন্ত্রস্ত। আমাদের বাড়ির সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, যেকোনো সময় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। আমার বাড়িতে আগুন দেওয়ারও আশঙ্কা করছি।’
পুলিশের বক্তব্য
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, ‘বাড়ির সামনের একটি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংসদ সদস্যের মেয়ের বিরোধের জের ধরে সোমবার একটি ঘটনা ঘটে। পুলিশ গিয়ে সেটি মীমাংসা করে। কিন্তু মঙ্গলবার আবার একই বিষয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে এলাকাবাসী তাদের বিচারের দাবিতে বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সংসদ সদস্য ও তার পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়।’
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মমিনুল হক বলেন, ‘দুইপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহসান হাবীব, র্যাব যশোর ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি প্রিন্সসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘ সময় এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখে।
জামায়াতের জরুরি বৈঠক
দিনের ঘটনার পর বিকেলে যশোর শহরের বারান্দিপাড়া এলাকায় জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দলের জেলা সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এমপির বাসভবনে হামলার ঘটনার নিন্দা জানানো হয়। বৈঠকে হামলার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়।
জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, ‘দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে জেলা আমিরের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তার বাসভবন অবরুদ্ধ করে ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি’।
সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণা, পরে বিক্ষোভ
জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জেলা জামায়াতের উদ্যোগে জজ কোর্ট মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে দড়াটানা মোড়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
মিছিলে জামায়াতে ইসলামী ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। তারা এমপির বাসভবনে হামলার প্রতিবাদ জানান এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদের বাসভবনে হামলা রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।’
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস, প্রচার সম্পাদক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস, শহর জামায়াতের আমির ইসমাইল হোসেনসহ স্থানীয় নেতারা।
ঘটনার পর জেলা জামায়াত প্রথমে প্রেসক্লাব যশোরে সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দলটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
যশোর বিএনপির বিবৃতি
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে এক বিবৃতি প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে তিনি জামায়াত এমপির বাড়ি ঘেরাও ও বিশৃঙ্খল ঘটনাকে ‘অনভিপ্রেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এমপি গোলাম রছুলের কন্যা অনন্যা মাদরাসাশিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আহত করার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার সাথে বিএনপির কোনো সংশ্রব না থাকলেও কেন্দ্রীয় জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রচার করে স্থানীয় বিএনপিকে দায়ী করা হয়। এ প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে যশোর বিএনপি।
তদন্তের ঘোষণা পুলিশের
দিনভর সংঘর্ষ, মহাসড়ক অবরোধ, বাসভবনে হামলা, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ফেসবুক লাইভে ক্ষমা- সব মিলিয়ে ঘটনাটি যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় একটি মাদরাসাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ। স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগ, মাদরাসার কার্যক্রমে বাধা দেওয়া এবং সেটি বন্ধের হুমকি থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সব দিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।