যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মোংলা বন্দরের সম্ভাবনা আটকে নাব্য সংকটে

বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ জুলাই,২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ২৪ জুলাই,২০২৬, ০৭:০০ পিএম
মোংলা বন্দরের সম্ভাবনা আটকে নাব্য সংকটে

পদ্মা সেতু-রেল সংযোগের সুফল পাচ্ছে না দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক হাব ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্রবন্দর। বন্দরটি ঘিরে হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। তবে বাস্তবে এর পূর্ণ সুফল পায়নি বন্দরটি।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন এবং রেল যোগাযোগ চালুর মধ্যদিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচনের আশা করেছিল সংশ্লিষ্টরা। সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা।

সুন্দরবন সংলগ্ন চ্যানেলে নাব্য সংকট, কাস্টমসের জটিলতা এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, আধুনিক জেটি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও পশুর নদী ও আন্তর্জাতিক নৌ-রুট মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের নাব্য সংকট বন্দরের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাস্টমসের জটিল শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ও পণ্যছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা। ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একাংশ এ বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

সম্ভাবনা আটকে নাব্য সংকটে

মোংলা বন্দরের প্রাণ হচ্ছে পশুর নদী। এই নদীপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করে। কিন্তু নদীর বিভিন্ন অংশে নিয়মিত পলি জমে নাব্য কমে যাওয়ায় বড় ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারছে না।

ব্যবসায়ীরা জানান, ৯ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের অনেক জাহাজকে বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। অনেকক্ষেত্রে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করে ছোট জাহাজ বা বার্জে করে বন্দরে আনতে হচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয় দুই-ই বেড়ে যাচ্ছে।

একজন আমদানিকারক বলেন, ‘একটি বড় জাহাজকে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতে হলে অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে, পণ্যের দামও প্রভাবিত হচ্ছে।’

শিপিং এজেন্টদের মতে, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো দ্রুত ও কম ব্যয়ের বন্দর খোঁজে। নাব্য সমস্যার কারণে অনেক কোম্পানি মোংলা বন্দরের পরিবর্তে বিকল্প বন্দরের দিকে ঝুঁকছে।

হাজার কোটি টাকার ড্রেজিংয়েও স্বস্তি নেই

নাব্য সংকট নিরসনে অতীতে একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুটি ড্রেজিং প্রকল্প সম্পন্ন করেছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বৃহৎ ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি হয়েছে।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ড্রেজিং নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে পশুর চ্যানেলের ইনার বারে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে জোয়ারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজকে সরাসরি জেটিতে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।

কাস্টমস জটিলতায় বাড়ছে ক্ষোভ

নাব্য সংকটের পাশাপাশি কাস্টমস ব্যবস্থার জটিলতাও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমদানিকারকদের অভিযোগ, পণ্যছাড়ে অযথা বিলম্ব, অতিরিক্ত কাগজপত্র যাচাই, দীর্ঘ শুল্কায়ন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ছে। অনেক সময় বন্দরে পণ্য আটকে থাকায় ডেমারেজ চার্জও গুনতে হচ্ছে।

একজন ব্যবসায়ীনেতা বলেন, ‘বন্দর উন্নত হয়েছে, কিন্তু সেবার মান সেই তুলনায় বাড়েনি। দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত না হলে ব্যবসায়ীরা অন্য বন্দরে চলে যাবে।’

রাজস্ব আয়েও প্রভাবের শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজ আগমন ও পণ্য পরিবহন কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়বে সরকারি রাজস্ব আদায়ে। মোংলা বন্দরকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়িত না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হবে।

পদ্মাসেতু চালুর পর মোংলা বন্দরের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে। রেল সংযোগ চালু হওয়ায় কনটেইনার পরিবহনের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বন্দরের মূল প্রবেশপথে নাব্য সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতা থাকায় সেই সুবিধার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বন্দর কর্তৃপক্ষ যা বলছেন

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নাব্য সংকট দূর করতে ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে বড় প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, নিয়মিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ের ফলে ভবিষ্যতে বড় জাহাজ চলাচল আরও সহজ হবে। পাশাপাশি কাস্টমস ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টা পণ্য খালাস সুবিধা, জেটি ও টার্মিনাল আধুনিকায়ন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং বন্দর ব্যবহার ব্যয় কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও বন্দর প্রশাসনের অংশগ্রহণে একটি ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সভার আয়োজন করা হবে, যেখানে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে।

সম্ভাবনার বন্দরে বাস্তবতার বাধা

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোংলা বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ। ভারত, নেপাল ও ভুটানের ট্রানজিট সুবিধা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে বন্দরের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

তবে নাব্য সংকট, কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা এবং সেবার মান উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ দ্রুত সমাধান করা না গেলে পদ্মা সেতু ও রেল যোগাযোগের মতো বৃহৎ বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল অর্জন কঠিন হবে।

মোংলা বন্দর এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে অপার সম্ভাবনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংকট। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে মোংলা বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার একটি আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক সমুদ্রবন্দরে পরিণত হবে, নাকি সম্ভাবনার ভারে চাপা পড়ে থাকবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)