সুবর্ণভূমি ডেস্ক
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের রাজনীতিকরণ, তাঁকে নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা কিংবা তাঁর ভক্তি শ্রদ্ধায় উগ্র-উন্মাদনা সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন সাদিকুর রহমান খান। এ প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া তার স্ট্যাটাসটি সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বেস্ট মন্তব্যটা করেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
কথাটা অনেকটা এমন, রবীন্দ্র বিরোধিতা করতে গিয়ে এক দল রবীন্দ্রনাথকে এত নিচে নামায়, যেটা তার প্রতি অসম্মান।
আবার রবীন্দ্রনাথের ভক্ত হইতে গিয়া অনেকে রবীন্দ্রনাথকে ঈশ্বর বানাইয়া ফেলেন, সেটাও উচিত না।
রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ, কালজয়ী আর্টিস্ট, তাকে আমাদের সেভাবেই দেখা উচিত।
আমি রবীন্দ্রনাথের রাজনীতির সাবস্ক্রাইবার না। কিন্তু আমি রবীন্দ্রনাথের বাইরের কেউও না।
সেই ছোটবেলা থেকেই তো শুরু।
নতুন নতুন পড়তে শিখেছি কেবল।
কবিতাই বেশি পড়ি, ছন্দ ওয়ালা জিনিস, ভালো লাগে। বেশিরভাগ কবিতাই এটা সেটা শেখায়। এমন সময় অদ্ভুৎ এক কবিতা এসে আমার স্বপ্ন গইড়া দিয়ে গেল।
মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে,
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে,
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে,
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে,
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে....
বাংলাদেশের সমস্ত ছেলেকে রবীন্দ্রনাথ বীরপুরুষ বানাইয়া ফেলে একেবারে পিচ্চি বেলা।
রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি কী, রবীন্দ্রনাথের আদর্শ কী এসব জানার আগেই এ দেশের প্রতিটা বাচ্চার মাথায় গেঁথে যায়, তাকে বীরপুরুষ হইতে হবে।
তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করে হলেও মাকে প্রোটেক্ট করতে হবে।
খারাপ কী, বলেন?
পোলাপানকে বীরপুরুষ বানাইয়া, সেই পোলাপান যখন বড় হয়, দূরে থেকে মাকে মনে পড়ে, তখন আবার রবীন্দ্রনাথ সেই বীরপুরুষদের হাজির করেন মোমের মত কোমল শব্দমালা,
মাকে আমার পড়ে না মনে,
শুধু হঠাৎ খেলতে গিয়ে কখন ঘরের কোণে,
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে,
আমার কথা মিলায় যেন মায়ের কথার মাঝে
মা বুঝি গান গাইত আমার দোলনা ঠেলে ঠেলে,
মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে.....
এই সব বীরপুরুষ একদিন বড় হয়। প্রেমে পড়ে। প্রেমে পড়লে আপনাদের কী মনে হয়, আমি জানি না। আমার কাছে প্রেম মানেই অন্তর থেকে আসা রবীন্দ্রনাথের সেই হাহাকারই,
আমার লতার একটি মুকুল ভুলিয়া তুলিয়া রেখো, তোমার অলকবন্ধনে....
আমার স্মরণ শুভ-সিন্দুরে একটি বিন্দু এঁকো– তোমার ললাটচন্দনে.....
আমার মনের মোহের মাধুরী মাখিয়া রাখিয়া দিয়ো তোমার অঙ্গসৌরভে.....
আমার আকুল জীবনমরণ টুটিয়া লুটিয়া নিয়ো তোমার অতুল গৌরবে
ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে
আমার পরানে যে গান বাজিছে তাহার তালটি শিখো তোমার চরণমঞ্জীরে.......
এই গান ছাড়া, এই আকুতি ছাড়া কারো প্রেম হয় কখনও?
তো যার মধ্যে প্রেম আছে, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ না থাকে কেমনে?
এরপর যখন বিচ্ছেদ হয়, তখনও কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথেই থাকি, শুধু কথাগুলো পরিবর্তন হয়ে আমাদের বিরহগুলো ভাসতে থাকে আসমানে,
সখী ভাবনা কাহারে বলে?
সখী যাতনা কাহারে বলে.....
তোমরা যে বলো দিবস রজনী ভলোবাসা ভালবাসা,
সখী ভালবাসা কারে কয় ?
সেকী কেবলই যাতনাময়......
এই ৫ টা লাইনের মধ্যে কোন রাজনীতি নাই, সমাজনীতি নাই, অর্থনীতিও নাই।
আছে একান্তই প্রাণ উজাড় করা দু:খ।
এই দু:খের বাইরে যদি আমরা না থাকি তবে আমরা রবীন্দ্রনাথের বাইরে থাকলাম কেমনে?
শুরুটা ছিল ছোটবেলা দিয়ে।
কী প্রাণশক্তি, কল্পনা আর রঙিন ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিলেন বীরপুরুষ হওয়ার স্বপ্ন,
এরপর জীবন যুদ্ধে যখন হেরে যাই, স্বপ্নগুলো যখন ক্লান্তি হয়ে বসে পড়ে বারান্দার পায়া ভাঙা সেই চেয়ারে চেয়ারে,
স্বপ্ন চলে গেলেও রবীন্দ্রনাথ তখনও থাকেন, ক্লান্ত হেরে যাওয়া সেই ব্যর্থ বীরপুরুষের কানে কানে বলতে থাকেন,
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা–
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা.....
আমরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াই।
যেই পাখিটাকে রবীন্দ্রনাথ পিচ্চি বয়সে উসকে দিলেন, মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে,
সেই পাখিটাই যখন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত, রবি তখন সেই পাখিটাকে বললেন,
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা.....
রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্বপ্ন ছুঁয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের ক্লান্তি ছুঁয়েছিলেন,
রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রেম ছুঁয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের বিরহও ছুঁয়েছেন।
তাই রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি আমার কাছে সবসময়ই থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার হয়েই থাকবে।
"ওহে এত প্রেম আমি, কোথা পাব নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে"র মত ব্যথার চেয়েও তীব্র সুখের একটা লাইন যিনি লিখতে পারেন, সেই ব্যথাকে আপন না করে পারি কী করে?