ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
‘আমার স্বামী চুরি করতে যায়নি, দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। অপবাদের বোঝা আর দুই সন্তানের কান্না নিয়ে দিন কাটে আমার।’
‘আমার কোনো টাকা-পয়সার লোভ নেই, কিচ্ছু লাগবে না। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার স্বামীকে যেন শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়। যাতে আমার এই নিষ্পাপ ছোট দুটো বাচ্চা চোরের সন্তান অপবাদ না শুনে মাথা উঁচু করে সমাজে বেঁচে থাকতে পারে।’
চোখের কোণে জমতে থাকা অশ্রু মুছে আকুল কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন আফিমাতুন নেছা। যশোর সদরের বলরামপুর গ্রামের তারেক রহমানের স্ত্রী তিনি। সরকারি এমএম কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে পড়ছিলেন তারেক, পাশাপাশি সংসার চালাতে চাকরি করতেন মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিকাশ-এ। ছয় বছরের মেয়ে তানিশ ফাতেমা তাসনিম আর চার বছরের ছোট ছেলেকে নিয়ে ভালোবাসায় মোড়ানো সুখের সংসার ছিল তাদের।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের এক নির্মম বিকেল নিমিষেই সবকিছু তছনছ করে দেয়।
ঐতিহাসিক সেই ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন সারা দেশে আনন্দের জোয়ার, তখন পুরো শহরের সাথে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন তারেকও। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রীর হাতে ওষুধ কিনে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্ত্রীর কাঁধে।
কিন্তু সেটা যে তার শেষ যাত্রা হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ। পরদিন সকালে যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে মেলে তার পোড়া মরদেহ। ৫ আগস্ট বিকেলে শহরের হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে লাগা আগুনে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার।
কিন্তু পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি আর শোকের চেয়েও বড় আঘাত হয়ে এসেছে সমাজের একাংশের নির্মম কটূক্তি। যে তরুণ দেশের শিক্ষিত যুবকদের রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছিলেন, মৃত্যুর পর তার স্বজনদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ‘অপপ্রচারের’- লুটপাট বা চুরির উদ্দেশ্যে জাবিরে গিয়েছিলেন তারেক।
এক বুক চাপা কষ্ট নিয়ে তারেকের মেয়ে তানিশ ফাতেমা তাসনিম বলে, ‘বাবা সেদিন আমাকে সাথে নিয়ে যায়নি, বলেছিল আমার জন্য খাবার নিয়ে আসবে। স্কুলে বা খেলায় বন্ধুরা যখন খারাপ কথা বলে, আমি গর্ব করে বলি, আমার বাবা কোনো খারাপ কাজে যায়নি, আমার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছে।’
ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের আন্দোলনে তারেক রহমানের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে যশোর জেলা প্রশাসন দুই লাখ টাকা এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন পাঁচ লাখ টাকার অনুদান দেয় তারেকের পরিবারকে। কিন্তু তা দিয়ে কি আর একজন কর্মক্ষম মানুষ তথা অভিভাবক হারানোর শূন্যতা পূরণ হয়? স্থায়ী কোনো পুনর্বাসন বা ভাতার ব্যবস্থা না হওয়ায় দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন আফিমাতুন নেছা। কোনো রাজনৈতিক দল বা স্থানীয় প্রতিনিধি পরে তাদের আর খোঁজ নেয়নি বলে জানান আফিমাতুন।
পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারেকের অকাল প্রয়াণের পর একটি গোছানো পরিবার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। আর্থিক দৈন্যের চেয়ে সামাজিক অবহেলা আর অপবাদের যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে। তার স্ত্রী আর অবুঝ সন্তানরা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়।