যশোর-খুলনা মহাসড়ক
শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
বছরের পর বছর ধরে যশোর-খুলনা মহাসড়কে সংস্কার আর পুনর্নিমাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি; ভোগান্তি লেগেই আছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যশোর-খুলনা মহাসড়কের প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশে দীর্ঘ নয় বছর ধরে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কাজ চলছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ সড়কে দু’টি প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে ৪৮৭ কোটি ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। বর্তমানে আরও দুটি প্রকল্পের অধীনে ৬৭ কোটি ১৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকার কাজ চলমান রয়েছে।
এ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৫৪ কোটি ৫৩ লাখ ৩ হাজার টাকা। বিপুল অঙ্কের এই অর্থ ব্যয়ের পরও সড়কটি এখনও কাদা, ধুলো ও যানজটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ব্যবসায়ী, চালক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে বারবার জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করায় সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না।
জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় ৬০০ বছরেরও বেশি আগে নির্মিত খুলনা-যশোর সড়কটি একসময় উত্তরবঙ্গ ও ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। বর্তমানে এটি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, নওয়াপাড়া নদীবন্দর, মংলা সমুদ্রবন্দর এবং ভোমড়া স্থলবন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান সংযোগপথ। প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন এ মহাসড়ক ব্যবহার করে। নেপাল, ভুটান, ভারত এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এ সড়কের গুরুত্ব রয়েছে।
সওজ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে মহাসড়কটি সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণের বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালে কাজ শেষ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভেঙে যায়। এরপর শুরু হয় পুনরায় সংস্কার। বর্তমানে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশে বিভিন্ন স্থানে সংস্কারকাজ চললেও তা ধীরগতির বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য মতে, ২০১৭ সালের পর থেকে এই মহাসড়কে ব্যয় হওয়া ৫৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশ অর্থ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে সম্পন্ন হওয়া দুই প্রকল্পে এবং বাকি প্রায় ১২ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে চলমান প্রকল্পে। কিন্তু এই ব্যয়ের তুলনায় সড়কের স্থায়িত্ব ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই সড়কে বারবার সংস্কার করায় সরকারি অর্থের কার্যকারিতা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
যশোর-খুলনা মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন মংলা সমুদ্রবন্দর ও নওয়াপাড়া নদীবন্দর থেকে সার, কয়লা, খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল ও আমদানি-রপ্তানির বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন করা হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
বাসচালক আমজাদ হোসেন বলেন, রাস্তার কারণে স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালানো যাচ্ছে না। কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দেরি হচ্ছে। এতে গাড়ির ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে গেছে।
পিকআপচালক মো. সামাদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট করে গাড়ি চালাচ্ছি। চেসিস, চাকা, স্টিয়ারিং হ্যাঙ্গার ভেঙে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়।
ট্রাকচালক সোহেল মিয়া বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একই অবস্থা। আগে সাত হাজার টাকায় যে টায়ার কিনতাম, এখন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাগে। কয়েক মাসের মধ্যেই টায়ার নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তার অবস্থার কারণেই গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেড়েছে।
টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে মহাসড়কের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি জমে কাদা ও বালিতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে যানবাহন আটকে থাকায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে।
পরিবহন চালকদের ও স্টাফদের মতে, দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সংযুক্ত এই মহাসড়কে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার চলতে থাকায় শুধু যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে শেষপর্যন্ত পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে শিল্প ও বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম সোহান বলেন, খুলনা-যশোর মহাসড়ক ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মংলা সমুদ্রবন্দর, অন্যদিকে নওয়াপাড়া নৌবন্দর। এখান থেকে খুলনা বিভাগের দশ জেলা এবং উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ এলাকায় খাদ্যশস্য, কয়লা ও সার পরিবহন হয়। দীর্ঘদিন সড়কটি অবহেলিত থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, সময়মতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা চাই, জরুরি ভিত্তিতে মানসম্মতভাবে সড়কের কাজ শেষ করা হোক।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাম্মী সুলতানা বলেন, কন্ট্রাক্টরকে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে দ্রুত মেরামতের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।