যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

‘অপবাদ’ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে আলিফের বাবা-মাকে

কাজী আশরাফুল আজাদ

, যশোর

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই,২০২৬, ১১:০০ এ এম
‘অপবাদ’ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে আলিফের বাবা-মাকে

“ছেলের মতো কাউকে দেখলে জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে কী যে হাহাকার কাউকে বোঝাতে পারবো না। খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না। কোনো শান্তি নেই জীবনে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রতিদিন গিয়েছে মেহেদী হাসান আলিফ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে শহীদ হলো আমার একমাত্র ছেলে। কষ্টে বুকটা ফেটে যায় যখন কিছু লোক আমাদের উদ্দেশে বলে, ‘চোরের মা, চোরের বাবা’। সঠিক কাহিনি না জেনে দেওয়া এই অপবাদের কষ্ট এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।”

ছেলের ছবিগুলো বুকে জড়িয়ে কেঁদে কেঁদে সুবর্ণভূমিকে এসব কথা বলছিলেন আলিফের মা মোমেনা বেগম ডলি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দিন যশোরের হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুনে পুড়ে যে ক’জনের জীবন গিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিল স্কুলছাত্র মেহেদী হাসান আলিফ। সে সময় তার বয়স ছিলো ১৫ বছর। পুলেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো সে।

যশোর শহরের রেলগেট তেতুঁলতলা চোরমারা দিঘিরপাড় আদর্শপাড়ার আব্দুল জলিলের বাড়িতে দুই দশক ধরে ভাড়া আছেন হারুন অর রশিদ ও মোমেনা বেগম ডলি দম্পতি। বাবা হারুন অর রশিদ যশোর-বেনাপোল রুটে বাস চালান। এই দম্পতির ছেলে আলিফ। তাদের মীম আক্তার (৯) নামে একটি মেয়ে আছে। সে সবে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

২০২৪ সালের সেই আন্দোলনমুখর দিনগুলোর কথা স্মরণ করছিলেন মোমেনা বেগম ডলি। তার ভাষ্য, ‘‘প্রতিদিন আলিফ আন্দোলনে যেতো। প্রতিদিন ছবি তুলে সে আমাকে পাঠাতো। কখনো কখনো বৃষ্টিতে ভিজে বাড়িতে আসতো। ৪ আগস্ট সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আলিফকে বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিই। আলিফ জবাব দিয়েছিল, ‘তুমি তো তোমার কথা ভাবছো। ঢাকায় কত মানুষ শহীদ হয়েছে। আমিও না হয় শহীদ হবো!’’

‘ছেলের কথা শুনে আঁতকে উঠতাম। ৫ আগস্ট ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে সে রান্নাঘরে যায়। বাড়িতে ওর বাবা ছিলো। বাইরে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু ও শোনেনি। যখনই সে আন্দোলনে বেরতো, আমার অনুমতি নিতো। কিন্তু ওইদিন এক জোড়া জুতো আগে থেকে রান্নাঘরে রেখে দেয়। বাবা যাতে না দেখে। এরপর জুতোজোড়া পায়ে দিয়ে আমার কাছ থেকে ২০ টাকা নিয়ে চুপিসারে বাইরে চলে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে ইশারায় আমার অনুমতি নেয়। সেই যে গেলো, রাতে ফিরলো লাশ হয়ে।’

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন সন্তানহারা এই নারী। ‘‘বিকেল হয়ে সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আলিফ না ফেরায় পাশে আরেক শহীদ মাহির মাকে ফোনে দিই। তিনি বলেন, ‘মাহি, আলিফ ও ইউসুফ এক সাথে বাইরে গেছে। বললো বিজয় মিছিলে যাবে। তাদেরও কোনো সন্ধান পাচ্ছি না।’ টেলিভিশনে হোটেল জাবিরে আগুনের সংবাদ দেখছি। অনেকে ফেসবুকে লাইভ দিয়েছিল। তা দেখছিলাম। কিন্তু ওই আগুনের মধ্যে যে আমার আলিফ আছে তা বুঝতে পারিনি।’’

কখন জানতে পারলেন মারা গেছে?- এমন প্রশ্নে ডলি বলেন, ‘যখন আলিফের কোনো সন্ধান পাচ্ছিলাম না, তখন আমি আর ওর বাবা বের হই। জাবিরের সামনে যাই, আবার হাসপাতালে যাই। দেখি শুধু অ্যাম্বুলেন্স যাতায়াত করছে। রাত নয়টার দিকে মর্গের সামনে যাই। সেখানে না পেয়ে মর্গের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পর একটি লাশ পেঁচানো প্যাকেট আসে জাবির হোটেল থেকে। ওই প্যাকেটের চেইন খুলতেই আলিফের মরদেহ দেখতে পাই। পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিলো শরীর। ওর প্যান্ট, শার্ট আর জুতো জোড়া দেখে চিনতে পারি। পরে রাত ১১টার দিকে লাশ হস্তান্তর করা হয় আমাদের কাছে। জানতে পারি, একই পাড়ার ইউসুফ, মাহিও মারা গেছে।’

সরকারিভাবে কেউ খোঁজ-খবর নিয়েছে কি না বা কোনো সহায়তা মিলেছে কি না জানতে চাইলে ডলি বলেন, ‘‘সাবেক প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ, যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই লাখ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়া জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে অনেক উপহার দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে আছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ডক্টর মোহাম্মদ ইউনূসের স্বাক্ষর করা ‘শ্রদ্ধাকার্ড’। জুলাই জাদুঘরে রাখা আছে আলিফের পায়ের স্যান্ডেল।”

সুবর্ণভূমির এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মায়ের সাথে ছেলের সব কিছুই স্মৃতিময়। যেদিন সকালে বাড়ি থেকে বাবাকে লুকিয়ে না খেয়ে চলে গেল, সেদিনের কথা কখনও ভুলবো না। আর ওর বাবা একজন গাড়িচালক। ছেলে চলে যাওয়ার পর বহুবার দুর্ঘটনায় পড়া উপক্রম হয়েছেন। আলিফের স্মৃতি সব সময় তার চোখে ভেসে থাকে।’

সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা জানতে চাইলে মোমেনা বেগম ডলি বলেন, ‘আলিফসহ জুলাইয়ে সকল হত্যার বিচার চাই। যশোরের যারা মারা গেছে, সেই ঘটনার সঠিক তদন্ত করে শহীদের মর্যাদা দিতে হবে।’

ডলি আক্ষেপ করে বলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বহুবার বাড়িতে এসেছে। অনেক তদন্ত করেছে। আলিফ যে একজন জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ তার সপক্ষে বহু প্রমাণাদি নিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মানুষ এখনো এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। অনেকে বলাবলি করে হোটেল জাবিরে যারা মারা গেছে, তারা সবাই চোর। ছিনিয়ে নিতে গিয়েছিল তারা।

তার যুক্তি, যারা মারা গেছে তারা কি আগুন দিয়েছে? আগুন লাগিয়েছে যারা তারা কি সেখানে থাকবে? সবাই কি ধান্ধা করতে গিয়েছিল? বহু মানুষ বিবেকের তাড়নায় উদ্ধার তৎপরতায় ছিলো। তাদের অনেকে মারা গেছে। তার মধ্যে আলিফও রয়েছে।

তিনি দ্রুত জেগেট প্রকাশ করে শহীদের সঠিক তালিকা প্রণয়নের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে দাবি করেন। বলেন, ‘ছেলেকে তো পাবো না। অন্তত শহীদ যোদ্ধার মা- এইটুকু সান্ত্বনা নিয়ে থাকি।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)