আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
বিশ্ব বাঘ দিবস এলেই সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণের নানা সাফল্যের গল্প সামনে আসে। বন বিভাগের ভাষ্য, বনের ভেতরে কৃত্রিম মিঠাপানির পুকুর খনন হচ্ছে, নির্মাণ করা হয়েছে ‘বাঘের কেল্লা’, আধুনিক প্রযুক্তিতে নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব বলছে, এসব উদ্যোগের সুফল মিলতে শুরু করেছে; কয়েক বছর ধরে বাঘের সংখ্যাও কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-সংখ্যা বাড়লেই কি বাঘ নিরাপদ?
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, গবেষকদের পর্যবেক্ষণ এবং সুন্দরবননির্ভর মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, উত্তরটি এতো সরল নয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের পরিবেশ। লবণাক্ততা বাড়ছে, কমছে মিঠাপানির উৎস, সংকুচিত হচ্ছে আবাসস্থল, হ্রাস পাচ্ছে খাদ্যপ্রাণী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বনদস্যু, চোরা শিকারি এবং বননির্ভর মানুষের জীবিকার চাপ। ফলে দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগের আড়ালেই বাঘের অস্তিত্বকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক নীরব কিন্তু গভীর সংকট।
জলবায়ুর আঘাতে বদলে যাচ্ছে বনের চরিত্র
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারির ভুক্তভোগী। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার বিস্তার বনের স্বাভাবিক পরিবেশকে দ্রুত পাল্টে দিচ্ছে। নদী ও খালে পলি জমে মিঠাপানির প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ছোট-বড় অনেক জলাধার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। সংকুচিত হচ্ছে বনের কার্যকর আবাসস্থল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পুরো বাস্তুতন্ত্রে। মিঠাপানির সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদ, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে তৃণভোজী প্রাণীর ওপর। শেষ পর্যন্ত খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরে থাকা রয়েল বেঙ্গল টাইগারই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
নিঃশব্দে বদলে যাওয়া সুন্দরবন
সংখ্যা কিংবা গবেষণার বাইরে বাস্তবতার সবচেয়ে বড় সাক্ষী বননির্ভর মানুষ। শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার দীর্ঘদিনের বনজীবী নুর ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বনে যাচ্ছি। আগে কিনারায় ভিড়লেই হরিণের পাল চোখে পড়তো, বাঘের আনাগোনাও দেখা যেতো। এখন সেই দিন আর নেই। পুরো বন যেন নিস্তব্ধ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ছে’।
তার এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি সুন্দরবনের পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্য কমছে, বাড়ছে লোকালয়ে বাঘের আনাগোনা
সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণ। বনজীবীদের দাবি, আগের তুলনায় হরিণের সংখ্যা কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পূর্ণাঙ্গ বাঘের স্বাভাবিক বিচরণের জন্য গড়ে ১৪ থেকে ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রয়োজন। কিন্তু আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যসংকটের কারণে সেই স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে বাঘ ক্রমেই লোকালয়সংলগ্ন এলাকায় চলে আসছে। এতে বাড়ছে মানুষ-বাঘ সংঘাত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শুধু সাতক্ষীরা উপকূলেই বন্যপ্রাণীর হামলায় ১৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৮ জনই প্রাণ হারিয়েছেন বাঘের আক্রমণে। নিহতদের প্রায় ৬০ শতাংশ ছিলেন মৌয়াল, ২২ শতাংশ বাউয়াল এবং ১৮ শতাংশ জেলে।
বন কি সত্যিই দস্যুমুক্ত?
সরকারিভাবে সুন্দরবনে দস্যুবিরোধী নানা অভিযানের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলী বলেন, ‘নদীতে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে গেলে শুধু ঝড়-তুফানের ভয় না, মানুষের তৈরি আতঙ্কও কম নয়। বনের ভেতরে দস্যুদের আনাগোনা এখনও রয়েছে। সুযোগ পেলেই জেলেদের আটকে চাঁদা আদায় করা হয়। সেই সঙ্গে বন্যপ্রাণী শিকারের খবরও আমরা পাই। মানুষই যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে বাঘ কীভাবে নিরাপদে থাকবে’?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনদস্যু ও চোরাশিকারি চক্র এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বনজীবীদের দাবি, একটি বাঘ শিকার করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচার করা গেলে অন্তত সাত লাখ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে অবৈধ বাণিজ্যের বড় লক্ষ্যই থাকে সুন্দরবনের বাঘ।
তাদের ভাষ্যমতে, দুইয়ের দশকে সুন্দরবনে যেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০, শিকার ও দস্যুতার কারণে তা একসময় নেমে আসে ১০০-এর কোঠায়।
মামলা আছে, কিন্তু শাস্তি কতটা কার্যকর
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে অন্তত ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বাঘ হত্যা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের অভিযোগে এ সময়ে ১৯টি মামলা হয়েছে। রায় হয়েছে ১০টির। আর প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়েছেন আসামিরা ৬টি মামলায়। এই পরিসংখ্যানই প্রশ্ন তুলছে-শিকার ও পাচারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর?
সংরক্ষণসংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় দুর্বলতা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব চোরাশিকারিদের নিরুৎসাহিত করতে পারছে না।
সংকট শুধু বাঘের নয়
জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিশনের সদস্য এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ খান মনে করেন, বাঘ সংরক্ষণকে শুধু একটি প্রাণী রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। তার ভাষায়, ‘সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারি হিসেবে বাঘের বেঁচে থাকা পুরো বনের খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে। লবণাক্ততা, মিঠাপানির তীব্র অভাব এবং শিকারি প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস-সবগুলো একসঙ্গে বাঘের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে বননির্ভর মানুষের জীবিকার সংকট যুক্ত হয়ে বিষয়টি আরও জটিল করে তুলেছে। তাই বাঘ রক্ষায় বাস্তুতাত্ত্বিক ও সামাজিক সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন’।
বিকল্প জীবিকা ছাড়া কমবে না বননির্ভরতা
সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা মাধব দত্ত বলেন, উপকূলীয় মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই কাঠ, মাছ, মধু কিংবা কাঁকড়া সংগ্রহের জন্য বনে যান। তার মতে, বননির্ভরতা কমানো না গেলে বনের ওপর চাপ কমবে না। একই সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না করা গেলে অবৈধ শিকার ও দস্যুতা বন্ধ করাও সম্ভব হবে না।
উদ্যোগের সুফল মিলছে, দাবি বন বিভাগের
সমালোচনার বিপরীতে বন বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ বলেন, ‘মিঠাপানির সংকট দূর করতে আমরা বনের ভেতরে কৃত্রিম পুকুর খনন করছি। প্রযুক্তির ব্যবহারে নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। আমাদের এসব তৎপরতা ও অভিযানের বলেই বাঘের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে’।
সংখ্যা নয়, টিকে থাকার প্রশ্ন
বাঘের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, সুন্দরবনের সংকট কেবল বাঘের সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, মিঠাপানির সংকট, খাদ্যপ্রাণীর হ্রাস, বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের তৎপরতা এবং বননির্ভর মানুষের জীবিকার বাস্তবতা-এসব একসঙ্গে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে চাপে ফেলছে।
বিশ্ব বাঘ দিবসে তাই শুধু নতুন উদ্যোগের ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে নীতির সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ কৌশল। কারণ সুন্দরবনের বাঘকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।