কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি
যশোরের কেশবপুরে বাঁশবাড়িয়া খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বছর দুই আগে একই খাল খনন করা হলেও ফের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই খাল খননে বেশকিছু টাকা নয়-ছয় হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাঁশবাড়িয়া খাল খনন করা হয়। আবার বছর দুই পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে একই খাল খননের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগই হাপিস করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খননের আওতায় কেশবপুর উপজেলার ধর্মপুর ব্রিজ থেকে তিন কিমি ৩৫০ মিটার বাসবাড়িয়া খালটি খনন করতে ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ২৩ মে খনন কাজ শুরু এবং ৩০ জুন তারিখের মধ্যে খনন কাজ শেষ বলে খাতাকলমে দেখানো হয়েছে। যার প্রকল্প চেয়ারম্যান করা হয় সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. কামরুল ইসলামকে।
প্রকল্প চেয়ারম্যান জানান, উপজেলা প্রশাসন ও পিআইও অফিসের কর্মকর্তারা খালটি ভেকু দিয়ে খননের জন্য সাব ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুলকে দিয়ে করানোর নির্দেশ দেন। দুইটি স্কেভেটর দিয়ে তিনি ৮/-১০ দিন ৪-৫ ঘণ্টা করে খাল খননের কাজ শেষ করেন। কিন্তু, ৭৯ হাজার ৫৩৮ ঘণ্টা ভেকু দিয়ে খনন দেখিয়ে ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৭ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা এবং ঠিাকাদার মুকুল।
এ বিষয়ে ঠিকাদার মুকুল জানান, তাকে দু’দফায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা অফিসের কর্তারা এবং প্রকল্প চেয়ারম্যান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
ইউপি মেম্বরের দাবি তিনি প্রকল্প চেয়ারম্যান হলেও কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় খালের দু’পাড়ে শ্রমিকদের মাটির কাজ এবং খাল পাড়ে তিনশ বনজ-ফলদ গাছ লাগানো কাজের দেখভাল করেছেন। গাছ লাগানো বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে চার লাখ ৪৫ হাজার ৪২৩ টাকা। সেখানে গাছ রোপণ করা হয়েছে মাত্র ৯৫টি। প্রতিটা গাছের মূল্য ধরা হয়েছে ৫০১ টাকা। অথচ ২০-৩০ টাকা মূল্যের ছোট গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রকল্প চেয়ারম্যানের দাবি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের অন্য সকল কাজ করেছেন মোকলেছুর রহমান মুকুল। এছাড়া, ১১৪ জন শ্রমিক দিয়ে খাল পাড়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। ওইসব শ্রমিকের প্রতিদিন মজুরি পাঁচশ টাকা হলেও দেওয়া হয়েছে তিনশ টাকা করে। এছাড়া মাত্র ৮-১০দিন ৫০-৬০ শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো হয়েছে বলে একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানান।
এদিকে, খাল খনন শেষে খালের দু’পাড়ে বিভিন্ন ধরনের ফলদ-বনজ গাছ রোপণ করার কথা থাকলেও রাস্তা সংলগ্ন খালের মুখে কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। মেহেরপুর এলাকায় কোনো গাছ রোপণ করা হয়নি, খালও খনন করা হয়নি বলে এলাকাবাসী জানায়।
এদিকে, বাঁশবাড়িয়া খালে অতিরিক্ত পানি না থাকলেও দুর্নীতি আড়াল করতে খালের কিছু অংশ খনন করা যাচ্ছে না বলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও প্রকল্প চেয়ারম্যান ছয় লাখ ২৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোযাগারে ফেরত দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা যায়।
এতে প্রকল্পের সর্বশেষ খরচ হয়েছে ৪৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ টাকা। ইতিমধ্যে খাল খননের বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অফিস সূত্র জানায়।
বাঁশবাড়িয়া গ্রামের কামরুজ্জামান ও আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বাঁশবাড়িয়া খালটি খনন করা হয়। খালের গভীরতাও রয়েছে অনেক। তার পরও খাল খননের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
একাধিক সূত্র জানায়, সব মিলিয়ে ৮-৯ লাখ টাকা খরচ করে খাল খননের নামে প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থ সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তাসহ প্রকল্প কমিটির সদস্যরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
সাব ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুল বলেন, ‘আমি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কর্মকর্তাদের অনুরোধে খালটি ভেকু দিয়ে খনন করেছি। এতে কাজের বিল হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। অথচ, বিল দেওয়া হয়েছে মাত্র সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। বাকি টাকা উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভাগবাটোয়ার করে নিয়েছেন।’
তবে, উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প অফিসের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প অনুযায়ী খাল খনন সম্পন্ন করা হয়েছে, সেখানে দুর্নীতির প্রশ্নই ওঠে না।
উপজেলার সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মুক্ত বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিএডিসির অর্থায়নে বাঁশবাড়িয়া খালটি খনন করা হয়।
প্রকল্প চেয়ারম্যান ইউপি সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, দুই বছর আগে খনন করা হলেও এ বছর আবার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। আমি প্রকল্প চেয়ারম্যান হলেও মুকুল উপজেলা প্রশাসন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ‘নিজস্ব লোক’ হিসেবে খাল তিনিই খনন করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী খান খননের জন্য মুকুলকে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইসতিয়াক হোসেন বলেন, খাল খননের কাজ প্রকল্প অনুযায়ী হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা সঠিক নয়।
এছাড়া, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওই খালটি খনন করা হয়েছে কি-না তা তিনি জানেন না বলে জানান।